মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৭৪
পাণ্ডবদের শিবিরে প্রবেশের পথে মহাদেবের আবির্ভাব
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
পাণ্ডবদের শিবিরে প্রবেশের পথে মহাদেবের আবির্ভাব
পাণ্ডবদের শিবিরের প্রবেশদ্বারের সামনে এসে অশ্বত্থামা দেখলেন, সেখানে এক মহাকায় দীপ্তিমান ভয়ঙ্করদর্শন লোমহর্ষকর পুরুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি রক্তমাখা বাঘের চামড়া পরে আছেন, কৃষ্ণসার হরিণের চামড়া তাঁর উত্তরীয়, তাঁর গলায় সাপের উপবীত, হাতে নানাবিধ অস্ত্র উদ্যত হয়ে আছে। তাঁর করাল মুখ, নাক, কান ও চোখ থেকে অগ্নিশিখা নির্গত হচ্ছে, তার কিরণে শত সহস্র শঙ্খচক্র গদাধর বিষ্ণু আবির্ভূত হচ্ছেন।
অশ্বত্থামা নির্ভয়ে সেই ভয়ংকর পুরুষের প্রতি বিবিধ দিব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করলেন, কিন্তু সেই পুরুষ সমস্ত অস্ত্রই গ্রাস কোরে ফেললেন। সমস্ত অস্ত্র বিফল হোলে অশ্বত্থামা দেখলেন, অসংখ্য বিষ্ণুর আবির্ভাবে সমস্ত আকাশ ঢেকে গেছে। তখন নিরস্ত্র অশ্বত্থামা কৃপাচার্যের উপদেশ স্মরণ কোরে অনুতপ্ত হলেন এবং রথ থেকে নেমে প্রণাম কোরে শূলপাণি মহাদেবের উদ্দেশে স্তব কোরে বললেন, হে দেবাদিদেব, যদি আজ এই ঘোর বিপদ থেকে উত্তীর্ণ হতে পারি তবে আপনাকে আমার এই পঞ্চভূতময় শরীর উপহার দেবো।
সেই সময় একটি কাঞ্চনময় দেবী আবির্ভূত হোলো এবং তাঁর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ঙ্কর আগুন জ্বলে উঠল। নানান রূপধারী বিকটাকার প্রমথগণ উপস্থিত হোলো। তাদের কেউ ভেরী কেউ শঙ্খ কেউ মৃদঙ্গ প্রভৃতি বাজাতে লাগল, কেউ কেউ নাচ ও গানে রত হোলো কেউ লাফাতে লাগল। সেই অস্ত্রধারী ভূতেরা অশ্বত্থামার তেজের পরীক্ষা এবং ঘুমন্ত যোদ্ধাদের হত্যা দেখবার জন্য শিবিরের চার দিকে বিচরণ করতে লাগল।
অশ্বত্থামা কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, ভগবান, আমি মহর্ষি অঙ্গিরার কুলে জন্ম নিয়েছি, আমার শরীর আগুনে আহুতি দিয়ে হোম করছি, আপনি এই আহুতি গ্রহণ করুন। এই বলে অশ্বত্থামা বেদীতে উঠে জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করলেন। তিনি ঊর্ধ্ববাহু ও নিশ্চেষ্ট হয়ে আছেন দেখে মহাদেব অশ্বত্থামাকে দেখা দিয়ে সহাস্যে বললেন, কৃষ্ণ অপেক্ষা আমার প্রিয় কেউ নেই, কারণ তিনি চিরকাল আমার আরাধনা করেছেন। তার সম্মান এবং তোমার পরীক্ষার জন্য আমি পাঞ্চালগণকে রক্ষা করছি এবং তোমাকে নানাপ্রকার মায়া দেখিয়েছি। কিন্তু পাঞ্চালগণ কালকবলিত হয়েছে, আজ তাদের জীবনান্ত হবে। এই বলে মহাদেব অশ্বত্থামার দেহে শক্তি সঞ্চার করলেন এবং তাকে একটি উত্তম তীক্ষ্ণধার খড়্গ দিলেন। অশ্বত্থামার তেজ অনেক বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি আত্যধিক বলশালী হয়ে শিবিরের অভিমুখে গেলেন, প্রমথগণ অদৃশ্য হয়ে তাঁর সঙ্গে চলল।
______________
(ক্রমশ)