মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৭৬
দুর্যোধনের মৃত্যু এবং দ্রৌপদীর অনশন
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
দুর্যোধনের মৃত্যু এবং দ্রৌপদীর অনশন
অশ্বত্থামা প্রভৃতি দুর্যোধনের কাছে এসে দেখলেন, তখনও তিনি জীবিত আছেন, অচেতন হয়ে রক্তবমন করছেন এবং অতি কষ্টে মাংশাসী জন্তুদেরকে তাড়াচ্ছেন। অশ্বত্থামা করুণ বিলাপ কোরে বললেন, পুরুষশ্রেষ্ঠ দুর্যোধন, তোমার জন্য শোক করি না, তোমার পিতামাতার জন্যই শোক করছি, তারা এখন ভিক্ষুকের মতো জীবিত থাকবেন। গান্ধারীপুত্র, তুমি ধন্য, শত্রুর সম্মুখীন হয়ে ধর্মানুসারে যুদ্ধ কোরে তুমি নিহত হয়েছ। কৃপাচার্য কৃতবর্মা আর আমাকে ধিক, আমরা তোমার সঙ্গে স্বর্গে যেতে পারছি না। মহারাজ, তোমার প্রসাদে আমার পিতার ও কৃপের গৃহে প্রচুর ধনরত্ন আছে, আমরা বহু যজ্ঞ করেছি, প্রচুর দক্ষিণাও দিয়েছি। তুমি চলে যাচ্ছ, পাপী আমরা কিপ্রকারে জীবনধারণ করবো? তুমি স্বর্গে গিয়ে দ্রোণাচার্যকে জানিও যে আজ আমি ধৃষ্টদ্যুম্নকে বধ করেছি। তুমি আমাদের হয়ে বাহ্লীকরাজ, জয়দ্ৰথ, সোমদত্ত, ভূরিশ্রবা, ভগদত্ত প্রভৃতিকে আলিঙ্গন কোরে কুশল জিজ্ঞাসা কোরো। দুর্যোধন, সুসংবাদ শোন - শত্রুপক্ষে কেবল পঞ্চপাণ্ডব, কৃষ্ণ ও সাত্যকি এই সাত জন অবশিষ্ট আছেন। আমাদের পক্ষে কৃপাচার্য, কৃতবর্মা আর আমি আছি। দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র, ধৃষ্টদ্যুম্নের পুত্রগণ এবং সমস্ত পাঞ্চাল ও মৎস্যদেশীয় যোদ্ধারা নিহত হয়েছে, হাতি ঘোড়া প্রভৃতির সাথে পাণ্ডব-শিবিরও ধ্বংস হয়েছে।
সুসংবাদ শুনে দুর্যোধন চৈতন্যলাভ কোরে বললেন, আচার্যপুত্র, তুমি কৃপাচার্য ও কৃতবর্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে যা করেছ, ভীষ্ম-দ্রোণ-কর্ণও তা পারেন নি। আজ আমি নিজেকে ইন্দ্রের সমান মনে করছি। তোমাদের মঙ্গল হোক, স্বর্গে আমাদের মিলন হবে। এই বলে কুরুরাজ দুর্যোধন প্রাণত্যাগ কোরে পুণ্যময় স্বর্গলোকে প্রস্থান করলেন, তার দেহ মাটিতে পড়ে রইল।
রাত্রি শেষ হলে ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে অশ্বত্থামার নৃশংস কাজের বৃত্তান্ত জানালে পুত্রশোকে আকুল হয়ে যুধিষ্ঠির ভূপতিত হলেন, তাঁর ভাইয়েরা এবং সাত্যকি তাকে ধরে ওঠালেন। যুধিষ্ঠির বিলাপ কোরে বললেন, লোকে পরাজিত হয়েও জয়লাভ করে, কিন্তু আমরা জয়ী হয়েও পরাজিত হয়েছি। যে রাজপুত্রেরা ভীষ্ম দ্রোণ ও কর্ণের হাতে মুক্তি পেয়েছিলেন তাঁরা আজ অসাবধানতার জন্য নিহত হলেন! ধনী বণিকেরা যেমন সমুদ্র উত্তীর্ণ হয়ে সতর্কতার অভাবে ক্ষুদ্র নদীতে ডুবে যায়, ইন্দ্রতুল্য রাজপুত্র ও পৌত্রগণ তেমনি অশ্বত্থামার হাতে নিহত হলেন। এঁরা স্বর্গে গেছেন, দ্রৌপদীর জন্যই শোক করছি, সে কি কোরে এই মহাদুঃখ সইবে? নকুল, তুমি দ্রৌপদীকে মায়েদের সঙ্গে এখানে নিয়ে এসো। তার পর যুধিষ্ঠির শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে শিবিরে গিয়ে দেখলেন, তাঁদের পুত্র পৌত্র ও বন্ধুরা ছিন্নদেহে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছেন। তিনি শোকে আকুল হয়ে অচেতনপ্রায় হলেন, শুভানুধ্যায়ীগণ তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন।
নকুল উপপ্লব্য নগর থেকে দ্রৌপদীকে নিয়ে এলেন। দ্রৌপদী কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে গেলেন, ভীম তাকে ধরে উঠিয়ে সান্ত্বনা দিলেন। দ্রৌপদী সরোদনে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, তুমি ক্ষত্রিয়ের ধর্ম অনুসারে পুত্রদের যমকে দান করেছ, এখন রাজ্য ভোগ করো। ভাগ্যক্রমে তুমি সমগ্র পৃথিবী লাভ করেছ, এখন আর বীর অভিমন্যুকে তোমার স্মরণ হবে না। আজ যদি তুমি পাপী দ্রোণপুত্রকে যুদ্ধে বধ না করো তবে আমি এখানেই অনশনে প্রাণত্যাগ করবো। পাণ্ডবগণ, তোমরা আমার এই প্রতিজ্ঞা জেনে রাখো। এই বলে দ্রৌপদী অনশন আরম্ভ করলেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, কল্যাণী, তোমার পুত্র ও ভাইয়েরা ক্ষত্রিয়ের ধর্ম অনুসারে নিহত হয়েছেন, তাদের জন্য শোক কোরো না। দ্রোণপুত্র দুর্গম বনে চলে গেছেন, যুদ্ধে তার নিপাত তুমি কি কোরে দেখতে পাবে? দ্রৌপদী বললেন, রাজা, শুনেছি অশ্বত্থামার মস্তকে একটি সহজাত মণি আছে। তুমি সেই পাপীকে বধ কোরে তার মণি মস্তকে ধারণ কোরে নিয়ে এসো, তবেই আমি জীবনত্যাগে বিরত হবো। তার পর দ্রৌপদী ভীমকে বললেন, তুমি ক্ষত্রিয়ধর্ম স্মরণ কোরে আমার পণ রক্ষা করো। তুমি জতুগৃহ থেকে ভাইদের উদ্ধার করেছিলে, হিড়িম্ব রাক্ষসকে বধ করেছিলে, কীচকের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করেছিলে, এখন দ্রোণপুত্রকে বধ কোরে সুখী হও।।
মহাবল ভীমসেন তখনই ধনুর্বাণ নিয়ে রথে চড়ে যাত্রা করলেন, নকুল তাঁর সারথি হলেন।
______________
(ক্রমশ)