মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৮০
পাণ্ডবদের প্রতি গান্ধারীর ক্রোধ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
পাণ্ডবদের প্রতি গান্ধারীর ক্রোধ
ধৃতরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পঞ্চপাণ্ডব গান্ধারীর কাছে গেলেন। পুত্রশোকার্তা গান্ধারী যুধিষ্ঠিরকে শাপ দিতে ইচ্ছা করেছেন জেনে দিব্যচক্ষুষ্মান অন্তর্যামী মহর্ষি বেদব্যাস তখনই গান্ধারীর কাছে উপস্থিত হলেন। তিনি গান্ধারীকে বললেন, তুমি পাণ্ডবদের উপর ক্রুদ্ধ হয়ো না। আঠারো দিন যুদ্ধের প্রতিদিনই দুর্যোধন তোমাকে বলত, মা, আমি শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি, আমাকে আশীর্বাদ করুন। তুমি প্রতিদিনই পুত্রকে বলতে, যে পক্ষে ধর্ম সেই পক্ষেরই জয় হবে। কল্যাণী, তুমি চিরদিন সত্য কথাই বলেছ। পাণ্ডবরা অত্যন্ত সংশয়াপন্ন হয়ে পরিশেষে তুমুল যুদ্ধে জয়ী হয়েছে, অতএব তাদের পক্ষেই অধিক ধর্ম আছে। তুমি পূর্বে ক্ষমাশীলা ছিলে, এখন ক্ষমা করছ না কেন? যে পক্ষে ধর্ম সেই পক্ষেরই জয় হয়েছে। দুর্যোধনকে বলা তোমার বাক্য স্মরণ কোরে পাণ্ডুপুত্রদের উপর ক্রোধ সংবরণ করো।
গান্ধারী বেদব্যাসকে বললেন, আমি পাণ্ডবদের দোষ দিচ্ছি না, তাদের বিনাশও কামনা করি না। পুত্রশোকে আমার মন ব্যাকুল হয়েছে। দুর্যোধন শকুনি কর্ণ আর দুঃশাসনের অপরাধেই কৌরবগণের বিনাশ হয়েছে। কিন্তু বাসুদেবের সামনেই ভীম দুর্যোধনের নাভির নিম্নদেশে গদাপ্রহার করেছে, সেজন্যই আমার অত্যন্ত ক্রোধ হয়েছে। যে বীর সে নিজের প্রাণরক্ষার জন্যও যুদ্ধকালে কি করে ধর্মত্যাগ করতে পারে?
ভীম ভয় পেয়ে কাতর স্বরে গান্ধারীকে বললেন, ধর্ম বা অধর্ম যাই হোক, আমি ভয়ের বশবর্তী হয়ে আত্মরক্ষার জন্য এমন করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন। আপনার পুত্রও পূর্বে অধর্ম অনুসারে যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেছিলেন এবং সর্বদাই আমাদের সঙ্গে কপটাচরণ করেছেন, সেজন্যই আমি অধর্ম করেছি। তিনি পাশা খেলার সভায় দ্রৌপদীকে কি বলেছিলেন তা আপনি জানেন। তার চেয়েও তিনি অন্যায় কাজ করেছিলেন – সভার মধ্যে সকলের সামনে দ্রৌপদীকে বাম ঊরু দেখিয়েছিলেন। দুর্যোধন নিহত হওয়ায় শত্রুতার অবসান হয়েছে, যুধিষ্ঠির রাজ্য পেয়েছেন, আমাদের ক্রোধও দূর হয়েছে।
গান্ধারী ভীমকে বললেন, তুমি দুঃশাসনের রক্ত পান কোরে অতি গর্হিত অনার্যের মতো নিষ্ঠুর কাজ করেছ। ভীম বললেন, রক্ত পান করা অনুচিত, নিজের রক্ত তো নয়ই। ভাইয়ের রক্ত নিজের রক্তেরই সমান। দুঃশাসনের রক্ত আমার দাঁত ও ঠোঁটের নীচে নামেনি, শুধু আমার দুই হাতই রক্তাক্ত হয়েছিল। যখন দুঃশাসন দ্রৌপদীর চুল ধরে আকর্ষণ করেছিল তখন আমি যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তাই আমি ক্ষত্রিয়ের ধর্ম অনুসারে পালন করেছি। আপনার পুত্রেরা যখন আমাদের অপকার করত তখন আপনি নিবারণ করেন নি, এখন আমাদের দোষ ধরা আপনার উচিত নয়।
গান্ধারী ভীমকে বললেন, আমার শত পুত্রের একটিকেও বাঁচিয়ে রাখলে না কেন? সে বৃদ্ধ পিতামাতার যত্ন নিত। তারপর গান্ধারী সক্রোধে জিজ্ঞাসা করলেন, সেই রাজা যুধিষ্ঠির কোথায়? যুধিষ্ঠির কাঁপতে কাঁপতে কৃতাঞ্জলি হয়ে গান্ধারীকে বললেন, আমিই আপনার পুত্রহন্তা নৃশংস যুধিষ্ঠির, আমাকে অভিশাপ দিন। গান্ধারী নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তার পা ধরবার জন্য যুধিষ্ঠির নীচু হলেন, সেই সময়ে গান্ধারী তার চোখের আবরণ বস্ত্রের আড়াল থেকে যুধিষ্ঠিরের আঙ্গুলের অগ্রভাগ দেখলেন, তার ফলে যুধিষ্ঠিরের সুন্দর নখ কুৎসিত হয়ে গেল। তারপর কৃষ্ণের পিছনে অর্জুনও গান্ধারীর কাছে এলেন। অবশেষে গান্ধারী ক্রোধমুক্ত হয়ে মায়ের মতো পাণ্ডবগণকে এবং কুন্তী ও দ্রৌপদীকে সান্ত্বনা দিলেন।
______________
(ক্রমশ)