মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৮৩
যুধিষ্ঠিরের মনস্তাপ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
যুধিষ্ঠিরের মনস্তাপ
কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য মানুষের মৃত্যুতে শোকসন্তপ্ত যুধিষ্ঠির অর্জুনকে বললেন, ক্ষত্রিয়ের আচরণ পৌরুষ ও ক্রোধকে ধিক, যার ফলে আমাদের এই বিপদ হয়েছে। আমাদের জয় হয়নি, দুর্যোধনেরও জয় হয়নি, তাঁকে বধ কোরে আমাদের ক্রোধ দূর হয়েছে, কিন্তু আমি শোকে কাতর হচ্ছি। অর্জুন, আমার রাজ্যে প্রয়োজন নেই, তুমিই রাজ্যশাসন করো। আমি তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য বনে যাবো, ছিন্নবস্ত্র ও জটা ধারণ কোরে তপস্যা করবো, ভিক্ষায় লব্ধ অন্নে জীবনধারণ করবো। বহু কাল পরে আমার প্রজ্ঞার উদয় হয়েছে, এখন আমি অব্যয় শাশ্বত স্থান লাভ করতে ইচ্ছা করি।
অর্জুন অসহিষ্ণু হয়ে বললেন, আপনি অমানুষিক কাজ সম্পন্ন কোরে এখন শ্রেষ্ঠ সম্পদ ত্যাগ করতে চান! যে পৌরুষহীন এবং অলস তার রাজ্যভোগ কি কোরে হবে? আপনি রাজকুলে জন্মেছেন, সমগ্র বসুন্ধরা জয় করেছেন, এখন বোকামির বশে ধর্ম ও অর্থ ত্যাগ কোরে বনে যেতে চাচ্ছেন! মহারাজ, অর্থ থেকেই ধর্ম কাম ও স্বর্গ হয়, অর্থ না থাকলে লোকের প্রাণধারণও অসম্ভব হয়। দেবগণও তাদের জ্ঞাতি অসুরগণকে বধ কোরে সমৃদ্ধি লাভ করেছিলেন। রাজা যদি অন্যের ধন হরণ না করেন তবে কি কোরে রাজকার্য করবেন? এখন সর্বদক্ষিণাযুক্ত যজ্ঞ করাই আপনার কর্তব্য, নতুবা আপনার পাপ হবে। মহারাজ, আপনি বিপথে যাবেন না।
ভীম বললেন, মহারাজ, আপনি মন্দবুদ্ধি বেদপাঠক ব্রাহ্মণের মতো কথা বলছেন। আপনি অলসভাবে দিনযাপন করতে চান তাই রাজধর্মকে অবজ্ঞা করছেন। আপনার এমন বুদ্ধি হবে জানলে আমরা যুদ্ধ করতাম না। আমাদেরই দোষ, বলশালী বিদ্বান ও মনস্বী হয়েও আমরা একজন পৌরুষহীন ব্যক্তির নির্দেশে চলেছি। বনে গিয়ে মৌনব্রত ও কপট ধর্ম অবলম্বন করলে আপনার মৃত্যুই হবে, জীবিকানির্বাহ হবে না।
নকুল সহদেবও যুধিষ্ঠিরকে নানাপ্রকারে বোঝাবার চেষ্টা করলেন। তারপর দ্রৌপদী বললেন, মহারাজ, তোমার ভাইয়েরা অনেক কথা বললেন, কিন্তু তুমি উত্তর দিয়ে এঁদের সন্তুষ্ট করছ না - এঁরা সকলেই দেবতুল্য, এঁদের প্রত্যেকেই আমাকে সুখী করতে পারেন। পঞ্চ ইন্দ্রিয় যেমন মিলিত হয়ে শরীরের ক্রিয়া সম্পন্ন করে তেমন আমার পঞ্চ পতি কি আমাকে সুখী করতে পারেন না? ধর্মরাজ, তুমি নির্বোধের মতো কথা বলছ, তোমার ভাইয়েরাও যদি বুদ্ধিভ্রষ্ট না হতেন তবে তোমাকে বেঁধে রেখে রাজ্যশাসন করতেন। মহারাজ, ব্যাকুল হয়ো না, পৃথিবী শাসন করো, ধর্মানুসারে প্রজাপালন করো।
অর্জুন আবার বললেন, মহারাজ, রাজদণ্ডই প্রজা শাসন করে, ধর্ম অর্থ কাম এই ত্রিবর্গকে রাজদণ্ডই রক্ষা করে। রাজার শাসন না থাকলে সমাজের বিনাশ হয়। ধর্মত বা অধৰ্মত যে উপায়েই হোক আপনি এই রাজ্য লাভ করেছেন, এখন শোক ত্যাগ কোরে ভোগ করুন, যজ্ঞ ও দান করুন, প্রজাপালন ও শত্রুনাশ করুন।
ভীম বললেন, আপনি সর্বশাস্ত্রজ্ঞ রাজা, কাপুরুষের মতো মোহগ্রস্ত হচ্ছেন কেন? আপনি শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ কোরে জয়ী হয়েছেন, এখন নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করুন। পিতৃপিতামহের অনুসরণ কোরে রাজ্যশাসন ও অশ্বমেধ যজ্ঞ করুন, আমরা এবং কৃষ্ণ আপনার পাশে রয়েছি।
যুধিষ্ঠির বললেন, ভীম, অজ্ঞ লোকে নিজের উদরের জন্যই প্রাণিহিংসা করে, অতএব সেই উদরকে জয় করো, অল্প আহারে ক্ষুধা নিবারণ করো। রাজারা কিছুতেই সন্তুষ্ট হন না, কিন্তু সন্ন্যাসী অল্পে তুষ্ট হন। অর্জুন, দুই প্রকার বেদবচন আছে - কর্ম করো, কর্ম ত্যাগ করো। তুমি যুদ্ধশাস্ত্রই জানো, ধর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্বে প্রবেশ করতে পারবে না। মোক্ষলাভে ইচ্ছুক ব্যক্তিগণ সন্ন্যাস দ্বারাই পরমগতি লাভ করেন।
মহাতপা মহর্ষি দেবস্থান ও বেদব্যাস বহু উপদেশ দিলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের মন শান্ত হোলো না। তিনি বললেন, বাল্যকালে যাঁর কোলে আমি খেলা করেছি সেই ভীষ্ম আমার জন্য নিপাতিত হয়েছেন, আমার মিথ্যা কথার ফলে আচার্য দ্রোণ নিহত হয়েছেন, জ্যেষ্ঠ ভাই কর্ণকেও আমি নিহত করিয়েছি, আমার রাজ্যলোভের জন্যই বালক অভিমন্যু প্রাণ দিয়েছে, দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র নিহত হয়েছে। আমি পৃথিবীনাশক পাপী, আমি ভোজন করবো না, পান করবো না, অনশনে প্রাণত্যাগ করবো। তপোধনগণ, আপনারা অনুমতি দিন, আমি এই শরীর ত্যাগ করবো।
অর্জুন কৃষ্ণকে বললেন, ধর্মপুত্র শোকসাগরে নিমগ্ন হয়েছেন, তুমি এঁকে আশ্বাস দাও। যুধিষ্ঠিরের বাহু ধরে কৃষ্ণ বললেন, শোক সংবরণ করুন, যাঁরা যুদ্ধে মরেছেন তাদের আর ফিরে পাবেন না। সেই বীরগণ যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ কোরে স্বর্গে গেছেন, তাদের জন্য শোক করা উচিত নয়। বেদব্যাস বললেন, যুধিষ্ঠির, তুমি ক্ষত্রিয়ধর্ম অনুসারেই ক্ষত্রিয়দের বিনাশ করেছ। যে লোক জেনে শুনে পাপকর্ম করে এবং তার পর নির্লজ্জ থাকে তাকেই পূর্ণ পাপী বলা হয়, এমন পাপের প্রায়শ্চিত্ত নেই। কিন্তু তুমি শুদ্ধস্বভাব, যা করেছ তা দুর্যোধনাদির দোষে অনিচ্ছায় করেছ এবং অনুতপ্তও হয়েছ। এরূপ পাপের প্রায়শ্চিত্ত মহাযজ্ঞ অশ্বমেধ, তুমি সেই যজ্ঞ করে পাপমুক্ত হও।
তারপর বেদব্যাস নানাপ্রকার পাপকর্ম এবং সে সকলের উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত বিবৃত করলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, আমি রাজধর্ম, চতুর্বর্ণের ধর্ম, আপৎকালোচিত ধর্ম প্রভৃতি সবিস্তারে শুনতে চাই। বেদব্যাস বললেন, তুমি যদি সর্বপ্রকার ধর্ম জানতে চাও তবে কুরুপিতামহ ভীষ্মের কাছে যাও, তিনি তোমার সমস্ত সংশয় নিরসন করবেন। যুধিষ্ঠির বললেন, আমি জ্ঞাতিসংহার করেছি, ছল কোরে ভীষ্মকে নিপাতিত করেছি, এখন কোন্ মুখে তার কাছে গিয়ে ধর্মজিজ্ঞাসা করবো?
কৃষ্ণ বললেন, বেদব্যাস যা বললেন তাই আপনি করুন। গ্রীষ্মকালের অন্তে লোকে যেমন মেঘের উপাসনা করে তেমন আপনার প্রজারা, হতাবশিষ্ট রাজারা এবং কুরুজাঙ্গালবাসী ব্রাহ্মণাদি চতুবর্ণের প্রজারা প্রার্থী রূপে আপনার কাছে সমবেত হয়েছেন। আপনি আমাদের সকলের খুশির জন্য লোকহিতে নিযুক্ত হন।
কৃষ্ণ, বেদব্যাস, দেবস্থান, ভাইয়েরা এবং অন্যান্য বহু লোকের অনুনয় শুনে যুধিষ্ঠিরের মনস্তাপ দূর হোলো, তিনি শান্তিলাভ কোরে নিজের কর্তব্য পালনে রাজি হলেন। তারপর ধৃতরাষ্ট্রকে সামনে নিয়ে শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির সমারোহ সহকারে হস্তিনাপুরে প্রবেশ করলেন।
______________
(ক্রমশ)