মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৮৯
পিতা মাতা গুরুর প্রতি ব্যবহার ও রাজকোষ পূর্ণ রাখার বিষয়ে ভীষ্মের উপদেশ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
পিতা মাতা গুরুর প্রতি ব্যবহার ও রাজকোষ পূর্ণ রাখার বিষয়ে ভীষ্মের উপদেশ
রাজার মিত্র, দণ্ডবিধি, রাজকর, যুদ্ধনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দেওয়ার পর ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বললেন, পিতা মাতা ও গুরুর সেবাই পরম ধর্ম। দশ জন শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ (বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ) অপেক্ষা পিতা শ্রেষ্ঠ, দশ জন পিতা বা সমস্ত পৃথিবী অপেক্ষা মাতা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আমার মতে পিতা ও মাতা অপেক্ষাও গুরু শ্রেষ্ঠ। মানুষের নশ্বর শরীর পিতা এবং মাতার থেকে উৎপন্ন হয়, কিন্তু গুরুর উপদেশে যে জন্মলাভ হয় তা অজর ও অমর।
যুধিষ্ঠির, ক্রোধের বশে কোনো লোক যদি তোমাকে কর্কশ বা কটু বাক্য বলে তবে তা গ্রাহ্য করবে না। যে অধম ব্যক্তি নিন্দাজনক কাজ কোরে আত্মপ্রশংসা করে তাকেও উপেক্ষা করবে। দুষ্ট ও খল স্বভাবের ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলাও উচিত নয়। মনু বলেছেন, যার দ্বারা প্রিয় বা অপ্রিয় সকল লোকের প্রতিই পক্ষপাতহীন ভাবে দণ্ড প্রয়োগ কোরে প্রজাদের পালন করা যায় তারই নাম ধর্ম। দণ্ডের ভয়েই লোকে একে অপরের হানি বা ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকে। সঠিক ভাবে ধর্মের নির্ধারণ করাকে ব্যবহার বা আইন বলে। বাদী এবং প্রতিবাদীর মধ্যে একজন বিশ্বাস উৎপাদন কোরে জয়ী হয়, অপর জন দণ্ডলাভ করে। এই ব্যবহার শাস্ত্র বা আইন শাস্ত্র রাজাদের সঠিক ভাবে জানা বিশেষ আবশ্যক। ব্যবহার দ্বারা যা নির্ধারিত হয় তাই বেদ, তাই ধর্ম, তাই সৎপথ। যে রাজা ধর্মনিষ্ঠ তার দৃষ্টিতে মাতা পিতা ভাই স্ত্রী পুরোহিত কেউ দণ্ডের বাইরে নন।
রাজকোষ যদি ক্ষয় পায় তবে রাজার শক্তিরও ক্ষয় হয়ে রাজা দুর্বল হয়। বিপদের সময় অধর্মও ধর্মের তুল্য হয় এবং ধর্মও অধর্মের তুল্য হয়। সংকটে পড়লে ব্রাহ্মণ নীচ শ্রেণীর লোক বা অযাজ্য লোকের জন্যেও যাজন করেন, নিষিদ্ধ এবং অভোজ্য অন্নও ভোজন করেন। ঠিক তেমনই ক্ষত্রিয় রাজা সংকটে পড়লে ব্রাহ্মণ ও তপস্বী ভিন্ন অন্যের ধন সবলে গ্রহণ করতে পারেন। অরণ্যচারী মুনি ছাড়া আর কেউ হিংসা বর্জন কোরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে না। ধনবান লোকের অপ্রাপ্য কিছু নেই, রাজকোষ পূর্ণ থাকলে রাজা সকল বিপদ থেকে উত্তীর্ণ হন।
______________
(ক্রমশ)