You, Still in Bengali Fiction Stories by Sohagi Baski books and stories PDF | তুমিই সেই

Featured Books
Categories
Share

তুমিই সেই

#পর্ব**১

বিকেলের আলোটা তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। শহরের প্রান্তে থাকা পুরোনো সেই রেললাইনটার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা। জায়গাটা খুব একটা লোকজন আসে না—একপাশে ঝোপঝাড়, অন্যপাশে আধভাঙা প্ল্যাটফর্ম, যেন সময় এখানে থেমে গেছে অনেক আগেই।
মেঘলার চোখ আজ অকারণে ভারী। এমন না যে সে কাঁদছে, আবার এমনও না যে সে ভালো আছে। একটা মাঝামাঝি অনুভূতি—যেটার নাম দেওয়া যায় না, শুধু বয়ে নিয়ে চলতে হয়।
হঠাৎ ট্রেনের দূরের হুইসেল কানে এল। শব্দটা শুনেই তার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল। ট্রেন মানেই তো চলে যাওয়া, ফেলে রেখে যাওয়া, অথবা নতুন কিছু শুরু করা। মেঘলা নিজেও জানে না—সে কোনটার অপেক্ষায় আছে।
এই রেললাইনটার সঙ্গে তার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। প্রতি বৃহস্পতিবার সে এখানে আসে। কেন আসে—এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও ঠিক জানে না। শুধু মনে হয়, এখানে এলে নিজেকে একটু কম একা লাগে।
আজও তাই।
হঠাৎ চোখে পড়ল—প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় কেউ বসে আছে।
মেঘলা একটু থমকে গেল। সাধারণত এই সময়টায় এখানে কেউ থাকে না। লোকটা বয়সে খুব বেশি বড় না, আবার ছোটও না। সাধারণ জামাকাপড়, কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত স্থিরতা—যেন সে কোথাও যেতে তাড়া করছে না, আবার থাকতেও আটকে নেই।
লোকটা তাকিয়ে আছে রেললাইনের দিকে, কিন্তু চোখে কোনো ট্রেন নেই—আছে শুধু অপেক্ষা।
মেঘলা অজান্তেই একটু এগিয়ে গেল।
তার পায়ের শব্দে লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। চোখাচোখি হতেই দুজনেই অস্বস্তিতে পড়ে গেল—এই অচেনা জায়গায় অচেনা একজনের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ার অস্বস্তি।
কিন্তু লোকটা চোখ সরাল না।
বরং খুব শান্ত গলায় বলল,
— “এই জায়গাটা কি আপনারও ভালো লাগে?”
মেঘলা একটু চমকে উঠল। প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ব্যক্তিগত।
— “ভালো লাগে না,” সে ধীরে বলল, “তবু আসি।”
লোকটা হালকা হাসল। সে হাসিতে কোনো জোর নেই, শুধু বোঝাপড়া আছে।
— “আমিও তাই,” সে বলল। “ভালো লাগে না, তবু চলে আসি।”
দুজনের মাঝখানে হঠাৎ একটা নীরবতা নেমে এল। কিন্তু সেটা ভারী নয়, বরং আরামদায়ক—যেন অনেকদিন পর কেউ না বুঝেও বুঝে গেছে।
মেঘলা বসে পড়ল একটু দূরে, একই লাইনে তাকিয়ে। সূর্য তখন প্রায় ডুবে যাচ্ছে। আকাশে কমলা আর বেগুনির মিশেল।
— “আপনি কী অপেক্ষা করছেন?”
লোকটার প্রশ্ন।
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
— “আমি জানি না। হয়তো নিজেরই কোনো পুরোনো অংশকে।”
লোকটা এবার সত্যিই তাকাল তার দিকে। যেন কথাটা সে বুঝেছে।
— “আমিও,” সে বলল। “কিছু মানুষ আসে জীবনে… যারা চলে যায়, কিন্তু পুরোপুরি যায় না।”
মেঘলার বুকের ভেতর কেমন একটা টান লাগল। এই কথাগুলো সে কাউকে বলেনি, অথচ এই অচেনা মানুষটা ঠিক সেগুলোই বলছে।
— “আপনার নাম কী?”
মেঘলা জিজ্ঞেস করল।
লোকটা একটু থামল। তারপর বলল,
— “নামটা গুরুত্বপূর্ণ না। নাম জানলেই তো মানুষ পরিচিত হয়ে যায়।”
মেঘলা হেসে ফেলল।
— “তাহলে আমিও নাম বলব না।”
দুজনেই হাসল। সেই হাসির মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, নেই কোনো দাবি—শুধু একটা অদ্ভুত স্বস্তি।
ট্রেন এসে থামল না। শুধু শব্দ করে চলে গেল।
লোকটা উঠে দাঁড়াল।
— “আজ উঠব না,” সে বলল। “আজ শুধু দেখা করার দিন ছিল।”
মেঘলা কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
লোকটা চলে যাওয়ার আগে একবার পিছন ফিরে তাকাল।
— “আবার দেখা হবে,” সে বলল।
— “হবে,” মেঘলা উত্তর দিল, নিজেও না জেনে কীভাবে এতটা নিশ্চিত হলো।
লোকটা মিলিয়ে গেল সন্ধ্যার ভিড়ে।
মেঘলা একা দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু আজ আর একা লাগছে না।
তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছে—
“তুমিই সেই…”লোকটা চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরও মেঘলা জায়গাটা ছাড়তে পারল না। রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল—কিছু একটা রেখে গেছে সে, অথচ কিছু নেয়নি। বাতাসে হালকা ঠান্ডা, সন্ধ্যার গন্ধ।
মেঘলা নিজের অজান্তেই ভাবল, মানুষ কীভাবে এত অল্প সময়ে অপরিচিত থেকে পরিচিত হয়ে যায়? নাম না জানা, ঠিকানা না জানা—তবু বুকের ভেতর যেন কেউ আলতো করে দরজায় কড়া নাড়ল।
সে হাঁটতে হাঁটতে প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় গেল। যেখানে লোকটা বসে ছিল, সেখানে পড়ে আছে একটা ছোট কাগজ। মেঘলা থমকে দাঁড়াল। মনে হচ্ছিল, এটা তুললে কিছু বদলে যাবে।
তবু তুলল।
কাগজটায় কিছু লেখা নেই—শুধু একটা তারিখ। আজকের তারিখ। আর নিচে খুব ছোট করে একটা লাইন—
“যে দেখা হঠাৎ হয়, সে কখনো হঠাৎ থাকে না।”
মেঘলার বুকটা কেঁপে উঠল। কথাটা যেন তাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা। সে কাগজটা মুঠোয় ভরে নিল।
রাস্তায় ফিরতে ফিরতে চারপাশের আলো জ্বলে উঠল। শহর তার চেনা চেহারায় ফিরেছে, কিন্তু মেঘলা যেন আর আগের মতো নেই। বুকের ভেতরে একটা অচেনা অপেক্ষা জন্ম নিয়েছে।
বাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে ভাবল—লোকটার চোখে কোনো তাড়া ছিল না, কিন্তু তার চলে যাওয়ায় যেন কিছু শুরু হয়ে গেছে। এই শুরুটা কোথায় যাবে, তা সে জানে না।
সেদিন রাতে ঘুম এল না মেঘলার। বারবার চোখে ভাসছে সেই শান্ত মুখটা, সেই নির্ভার কণ্ঠ। নিজের ওপরেই রাগ হলো—এত ভাবছে কেন? যে মানুষটার নামও জানে না!
হঠাৎ তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।
অচেনা নাম্বার।
মেসেজে লেখা—
“রেললাইনটার পাশে একটা বেঞ্চ আছে। বৃহস্পতিবারগুলো খেয়াল রাখবে।”
মেঘলা উঠে বসল। বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। নাম্বারটা সে চিনতে পারছে না, কিন্তু মনে হচ্ছে—চেনা।
সে টাইপ করল,
“আপনি কে?”
কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এল—
“যে অপেক্ষা করে।”
মেঘলা ফোনটা বুকে চেপে ধরল। জানালার বাইরে রাত গভীর। শহর ঘুমাচ্ছে, কিন্তু তার ভেতরে গল্পটা জেগে উঠেছে।
মেঘলা ফোনটা ধীরে পাশে নামিয়ে রাখল। ঘরের আলো নিভু নিভু, জানালার বাইরে দূরের স্ট্রিটলাইটগুলো কুয়াশার ভেতর ঝাপসা হয়ে আছে। “তুমিই সেই”—এই কথাটা বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে, যেন কেউ ফিসফিস করে বলে চলেছে।
হঠাৎ তার মনে পড়ল—এই অনুভূতিটা নতুন নয়।
অনেক বছর আগে, ঠিক এমনই এক সন্ধ্যায়, সে প্রথমবার কাউকে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। তখন সে কলেজে পড়ে। প্রতিদিন একই বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ—চুপচাপ, নিজের মতো। নাম জানা হয়নি কখনো, কথাও খুব বেশি হয়নি। শুধু একদিন চোখাচোখি হয়েছিল, আর সেই চোখেই ছিল একরাশ নিশ্চয়তা।
সেই নিশ্চয়তাই ভেঙে গিয়েছিল সবচেয়ে নির্দয়ভাবে।
একদিন সে আর আসেনি। পরের দিনও না। তারপর আর কোনোদিনই না।
মেঘলা সেদিন বুঝেছিল—সব অপেক্ষার শেষ দেখা দিয়ে হয় না। কিছু অপেক্ষা মানুষকে ভেতর থেকে ফাঁকা করে দেয়।
এই ফাঁকটাই সে বয়ে বেড়াচ্ছে এতদিন।
রেললাইনের ধারে বৃহস্পতিবারে বৃহস্পতিবারে এসে দাঁড়ানোটা আসলে কোনো অভ্যাস নয়—ওটা এক ধরনের ক্ষমা চাওয়া। নিজের কাছে, নিজের পুরোনো বিশ্বাসের কাছে।
আর আজ, এত বছর পর, এক অচেনা মানুষ এসে ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়াল—যেখানে মেঘলা ভেবেছিল আর কখনো কিছু দাঁড়াবে না।
সে চোখ বন্ধ করল।
লোকটার গলা কানে বাজল—
“কিছু মানুষ আসে জীবনে… যারা চলে যায়, কিন্তু পুরোপুরি যায় না।”
এই কথাটা কেউ জানত না। কেউ জানার কথাও নয়।
মেঘলা উঠে জানালার কাছে দাঁড়াল। কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল—চোখ দুটো আগের মতো নেই। সেখানে ভয় আছে, আবার একটা ক্ষীণ আলোও আছে।
সে ভাবল, এই মানুষটা কি শুধু তার পুরোনো ক্ষতটাই ছুঁয়ে দেখাতে এসেছে? নাকি সেলাই করতে?
ফোনটা আবার হাতে নিল। অচেনা নাম্বার। আবার মেসেজ এল না। নীরবতা।
এই নীরবতাটাই ভয়ংকর।
কারণ নীরবতার ভেতরেই মানুষ সবচেয়ে বেশি আশা করে।
পরদিন সকালে মেঘলা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। কাজে গেল, হাসল, কথা বলল। কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন সে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে—হাওয়ায় চুল উড়ছে, চোখে সূর্যডোবার আলো।
বিকেলে হঠাৎ তার মনে হলো—লোকটা যদি আর না আসে?
এই প্রশ্নটাই বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধল। এত বছর সে কাউকে না আসার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এবার সে প্রস্তুত নয়।
বৃহস্পতিবার আসতে এখনো দু’দিন বাকি।
মেঘলা জানে না, এই দু’দিন সে কীভাবে কাটাবে।
শুধু জানে—এই গল্পটা আর শুধু অতীত নয়।
এটা বর্তমানের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
আর কিছু গল্প থাকে…
যেগুলো শুরু হয় অচেনা পরিচয়ে,
কিন্তু শেষ হয় নিজের ঠিকানা খুঁজে পেয়ে।



#পর্ব**২
বৃহস্পতিবারটা মেঘলার জীবনে আগে কখনো এমন ভারী হয়ে আসেনি। ঘড়ির কাঁটা যেন ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে। সকাল থেকে সে কয়েকবার অকারণে ফোনটা হাতে নিয়েছে, আবার রেখে দিয়েছে। কোনো মেসেজ আসেনি, তবু মনটা বারবার বলে উঠছে—কিছু একটা হবে।
আকাশটা আজ অদ্ভুত রকমের শান্ত। এমন শান্ততা সাধারণত ঝড়ের আগেই আসে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই মেঘলা আর ঘরে থাকতে পারল না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজের দিকে তাকাল—খুব সাধারণ সাজ, তবু চোখে একটা প্রশ্ন। সে নিজেই জানে না, সে কাকে দেখতে যাচ্ছে, কী আশা নিয়ে যাচ্ছে।
রেললাইনটার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আকাশে লালচে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। দূর থেকে ট্রেনের শব্দ আসছে, কিন্তু সে থামে না। তার পা নিজের মতো করে এগিয়ে চলে।
বেঞ্চটা সেখানে আছে—ঠিক আগের জায়গাতেই।
মেঘলার বুক ধুকপুক করতে থাকে। সে বেঞ্চটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে বসে পড়ে। চারপাশে কেউ নেই। বাতাসে শুকনো পাতার শব্দ।
সময় যায়।
পাঁচ মিনিট।
দশ মিনিট।
মনের ভেতর ভয়টা মাথা তোলে—হয়তো আজ আর কেউ আসবে না। হয়তো ওই মানুষটা শুধু এক বিকেলের গল্প ছিল। মানুষের জীবনে এমন গল্প তো থাকেই—যেগুলো শুরু হয়, কিন্তু আর এগোয় না।
মেঘলা উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই—
— “ভাবছিলাম, আপনি আসবেন কি না।”
গলাটা খুব কাছ থেকে এল।
মেঘলা ঘুরে দাঁড়াল।
সে।
একই শান্ত মুখ, একই চোখ। আজ তার হাতে একটা কাপ—ধোঁয়া উঠছে।
— “চা,” সে বলল, “এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে চা দরকার হয়।”
মেঘলা কথা বলতে পারল না। বুকের ভেতর যে চাপটা জমেছিল, সেটা হঠাৎ হালকা হয়ে গেল।
— “আপনি দেরি করলেন,” সে শুধু এটুকু বলল।
লোকটা হালকা হাসল।
— “ইচ্ছা করেই। দেখতে চেয়েছিলাম, আপনি থাকেন কি না।”
মেঘলা তাকিয়ে রইল।
— “আর আমি?”
— “আপনিও,” সে বলল, “আমার জন্য অপেক্ষা করলেন।”
এই কথাটার মধ্যে কোনো দাবি নেই, তবু মেঘলার চোখ একটু ভিজে উঠল। সে চায়ের কাপটা নিল। গরম চা হাতে নিয়ে মনে হলো, কেউ তার ভেতরের ঠান্ডাটা বুঝেছে।
দুজনেই বসে পড়ল বেঞ্চে। মাঝখানে সামান্য দূরত্ব—কাছেও না, দূরেও না।
— “আপনি নাম জানতে চাননি,” লোকটা বলল।
— “আপনিও তো বলেননি,” মেঘলা উত্তর দিল।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর লোকটা ধীরে বলল,
— “নাম জানলে মানুষ জড়িয়ে পড়ে।”
মেঘলা চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
— “আর না জানলে?”
— “না জানলে মানুষ নিরাপদ থাকে,” সে বলল, “কিন্তু ফাঁকা।”
এই কথাটা যেন সরাসরি মেঘলার বুকের ভেতরে ঢুকে গেল।
ট্রেন চলে গেল পাশ দিয়ে। বাতাসে শব্দ, আলো, গতি—কিন্তু বেঞ্চে বসে থাকা দুজন মানুষের সময়টা স্থির।
— “আপনি কী করেন?” মেঘলা জিজ্ঞেস করল।
— “আমি মানুষ দেখি,” সে বলল।
— “এটা কী কাজ?”
— “যারা নিজেকে লুকাতে চায়, তাদের চোখে সেটা লেখা থাকে।”
মেঘলা হেসে ফেলল, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কষ্ট লুকানো।
— “তাহলে আমাকে কেমন দেখছেন?”
লোকটা তাকাল তার চোখের দিকে। অনেকক্ষণ। তারপর বলল,
— “আপনি কাউকে হারাননি। আপনি নিজের একটা বিশ্বাস হারিয়েছেন।”
এই কথার পর আর কিছু বলার থাকে না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আকাশে প্রথম তারা জ্বলে ওঠে।
লোকটা উঠে দাঁড়াল।
— “আজ এখানেই থাক,” সে বলল। “সব গল্প একদিনে বলা যায় না।”
মেঘলার বুকের ভেতর কেমন একটা খালি লাগল।
— “আবার আসবেন?”
সে এবার সরাসরি বলল।
লোকটা এক মুহূর্ত থামল। তারপর খুব শান্তভাবে বলল,
— “যতদিন আপনি আসবেন।”
এই কথাটাই যথেষ্ট।
লোকটা চলে গেল। আজ আর পিছন ফিরে তাকাল না।
মেঘলা একা বসে রইল বেঞ্চে। কিন্তু আজ একা লাগছে না। আজ সে জানে—এই অপেক্ষা আর একতরফা নয়।
রেললাইনের ওপারে আলো জ্বলে উঠছে। শহর আবার নিজের মতো।
আর মেঘলার ভেতরে, খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে—
একটা নতুন গল্প জায়গা করে নিচ্ছে।
লোকটা মিলিয়ে যাওয়ার পরও মেঘলা উঠে দাঁড়াল না। বেঞ্চটার কাঠে হাত রেখে বসে থাকল কিছুক্ষণ, যেন এখান থেকে উঠলেই এই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে। বাতাসে এখনও চায়ের হালকা গন্ধ, অথবা হয়তো সেটা শুধু তার কল্পনা।
সে ভাবল—কী আশ্চর্য, কিছু মানুষ আসে জীবনে, যাদের সঙ্গে খুব কম কথা হয়, অথচ সেই অল্প কথাগুলোই ভেতরের অনেক না বলা কথা খুলে দেয়।
মেঘলা ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তার মনে পড়ল সেই দিনটার কথা—যেদিন সে প্রথম নিজেকে শক্ত করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন সে ভেবেছিল, আর কখনো কাউকে এমন জায়গায় ঢুকতে দেবে না, যেখানে ঢুকলে চলে যাওয়ার ক্ষমতা থাকে। বিশ্বাসের দরজাটা সে আধখোলা রেখেছিল শুধু বাতাস ঢোকার জন্য, মানুষ ঢোকার জন্য নয়।
আজ সেই দরজায় কেউ এসে কড়া নাড়ল। জোরে না। খুব ভদ্রভাবে।
আর ভয়টা এখানেই—ভদ্র কড়া মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া সবচেয়ে কঠিন।
বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে সে বুঝল, এই দেখা তার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিশে যাচ্ছে। এটা আর শুধু বৃহস্পতিবারের গল্প নয়। এটা তার চিন্তায় ঢুকে পড়েছে, তার নীরবতায় জায়গা নিয়েছে।
রাস্তায় ফিরতে ফিরতে সে নিজের অজান্তেই বারবার পিছনে তাকাল। জানে, কেউ নেই। তবু মনটা মানতে চাইছে না।
সেই রাতে মেঘলা অনেকদিন পর একটা কাজ করল—ডায়েরি খুলল।
পাতার ওপর কলম ছোঁয়াতেই হাত কেঁপে উঠল। অনেকক্ষণ পর সে লিখল—
“আজ কাউকে চিনিনি। তবু আজ নিজেকে একটু বেশি চিনেছি।”
কলম থামিয়ে সে জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে চাঁদ নেই, তবু অন্ধকারটা ভয় লাগাচ্ছে না।
হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠল।
অচেনা নাম্বার।
একটা মাত্র লাইন—
“কিছু প্রশ্নের উত্তর পেতে সময় লাগে। তাড়াহুড়ো কোরো না।”
মেঘলা হাসল। খুব হালকা একটা হাসি। মনে হলো, কেউ দূর থেকেই তার চিন্তাটা বুঝে ফেলেছে।
সে কোনো রিপ্লাই দিল না।
কিছু কথার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিলে তাদের গভীরতা নষ্ট হয়ে যায়।
ঘড়ির দিকে তাকাল—রাত অনেক। তবু ঘুম আসছে না। কিন্তু আজ এই না-ঘুমের মধ্যে অস্থিরতা নেই। আছে শুধু একটা অদ্ভুত নিশ্চয়তা—যেন গল্পটা নিজে থেকেই এগোচ্ছে, তাকে শুধু উপস্থিত থাকতে হবে।
মেঘলা জানে না, এই মানুষটা তার জীবনে কতদূর থাকবে। কিন্তু সে এটুকু জানে—এই বৃহস্পতিবার আর আগের বৃহস্পতিবারের মতো থাকবে না।
কারণ অপেক্ষার রং বদলে গেছে।
আর কিছু অপেক্ষা থাকে,
যেগুলো ক্লান্ত করে না—
বরং মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।



#পর্ব***৩
লোকটা রেললাইন ছেড়ে অনেক দূর চলে এসেছে, তবু তার মনে হচ্ছিল—সে এখনো ওই বেঞ্চটার কাছেই আছে। পায়ের নিচে রাস্তার শব্দ, চারপাশে শহরের আলো, কিন্তু মনটা আটকে আছে এক জোড়া চোখে—যে চোখে ভয় ছিল, তবু পালিয়ে যায়নি।
সে জানত, আজ না এলে মেঘলা হয়তো আর কোনোদিনই আসত না।
কিছু মানুষ থাকে—যাদের জীবনে “আর একবার” বলে কিছু থাকে না।
লোকটা এই সত্যটা খুব ভালো করেই জানে।
সে হাঁটতে হাঁটতে নিজের ফ্ল্যাটে পৌঁছাল। দরজা বন্ধ করতেই নিঃশব্দ ঘরটা যেন তাকে চেপে ধরল। কোটটা খুলে চেয়ারে রাখল, জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। নিচে গাড়ি চলছে, মানুষ যাচ্ছে—কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না।
এই শহরে কেউ কাউকে চেনে না। তবু কেউ কেউ কাউকে ঠিক চিনে ফেলে।
তার মনে পড়ল—বছর তিনেক আগের কথা।
একদিন হঠাৎ করে তার জীবনে সবকিছু থেমে গিয়েছিল। কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই। খুব সাধারণভাবে। যেভাবে মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে—সে আর আগের মানুষটা নেই। যাকে সে বিশ্বাস করেছিল, সে বিশ্বাসটাকেই সবচেয়ে যত্ন করে ভেঙে দিয়েছিল।
সেদিন থেকে লোকটা শিখে নিয়েছিল—নাম না বলা, বেশি কাছে না যাওয়া, প্রশ্ন না করা।
মানুষকে দূর থেকে দেখাই নিরাপদ।
কিন্তু মেঘলার ক্ষেত্রে সেই নিয়মটাই ভেঙে গেছে।
সে জানে না কেন, কিন্তু প্রথম দেখাতেই তার মনে হয়েছিল—এই মেয়েটা পালাতে জানে, তবু দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। এই দাঁড়িয়ে থাকাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
লোকটা জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। মুখে ক্লান্তি, চোখে পুরোনো ছায়া। সে নিজেকেই প্রশ্ন করল—সে কি আবার ভুল করতে চলেছে?
ফোনটা টেবিল থেকে তুলে নিল। নাম্বারটা সে মুখস্থ করে ফেলেছে। কিন্তু কল করল না। কিছু সম্পর্কের শুরু হয় না—তারা শুধু চলতে থাকে।
ঠিক তখনই ফোনে নোটিফিকেশন এল।
মেঘলার নাম নেই। তবু সে বুঝে গেল।
একটা ছবি।
রেললাইনটার ছবি। বেঞ্চটা। খালি।
তার নিচে লেখা—
“আজ জায়গাটা ফাঁকা ছিল না।”
লোকটা চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর একটা চাপা শ্বাস আটকে গেল। সে রিপ্লাই করল না। শুধু ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
এই নীরবতাই তাদের ভাষা।
পরদিন সকালে সে বেরোল কাজে। মানুষের ভিড়, কথা, হাসি—সবই আছে। তবু কোথাও যেন একটা অংশ রয়ে গেছে, যা এই ভিড়ে মিশছে না।
দুপুরে সে একটা ক্যাফেতে ঢুকল। জানালার পাশে বসে কফি অর্ডার করল। হঠাৎ দেখল—একজন মেয়ে জানালার ধারে বসে ডায়েরি লিখছে। মুহূর্তের জন্য বুকটা কেঁপে উঠল। মেঘলা নয়। তবু সে বুঝল—মানুষ কত সহজেই স্মৃতির সঙ্গে গুলিয়ে যায়।
সে মাথা নিচু করে নিল।
এই গল্পটা এখনো নামহীন। আর নামহীন গল্পগুলোই সবচেয়ে গভীরে যায়।
বিকেলে কাজ শেষে সে আবার সেই রাস্তায় এল—রেললাইনটার দিকে যাওয়ার পথে। আজ বৃহস্পতিবার নয়। তবু পা থামল।
দূর থেকে বেঞ্চটা দেখা যাচ্ছে।
খালি।
সে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ঘুরে চলে এল। সে জানে, প্রতিটা দেখা আগেই শেষ করে দিলে, অপেক্ষার মানে থাকে না।
রাতে ঘুমোবার আগে সে নিজের পুরোনো নোটবুকটা খুলল। অনেকদিন কেউ পড়েনি এটাকে। পাতার ভাঁজে লেখা ছিল—
“আমি আবার বিশ্বাস করতে পারি। কিন্তু আমি তাড়াহুড়ো করব না।”
লোকটা কলমটা নামিয়ে রাখল।
সে জানে না, এই গল্প কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
সে শুধু জানে—এবার সে পালাচ্ছে না।
নোটবুকটা বন্ধ করার পর লোকটা আলো নিভিয়ে দিল। ঘরটা অন্ধকারে ডুবে গেল, কিন্তু তার চোখে ঘুম এল না। অন্ধকারে শুয়ে থাকলে মানুষ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে নিজেকে শুনতে পায়—আর সে শুনতে পাচ্ছিল নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বটা।
সে জানত, মেঘলা এখনো প্রশ্ন করছে না। এই না-প্রশ্ন করাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি নড়বড়ে করে দিচ্ছে। কারণ প্রশ্ন এলে মানুষ নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারে, উত্তর সাজাতে পারে। কিন্তু নীরবতা—সেটা প্রস্তুতির সুযোগ দেয় না।
তার মনে পড়ল, একসময় কেউ তাকে বলেছিল—
“তুমি সব সময় অর্ধেক থাকো। পুরো হতে ভয় পাও।”
সেদিন সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা। আজ বুঝতে পারছে, মানুষ অনেক সময় সত্যটা বুঝতে দেরি করে।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই সে প্রথম যেটা করল—ফোনটা হাতে নিল। কোনো মেসেজ নেই। অকারণে একটা স্বস্তি হলো। অকারণেই আবার মনটা ভারী হয়ে গেল।
সে কাজে বেরোল। লিফটের আয়নায় নিজের মুখটা দেখে থমকে গেল—এই মুখটা কি আবার কারো গল্পের অংশ হতে চায়? নাকি শুধু পর্যবেক্ষক হয়ে থাকাই তার জন্য নিরাপদ?
দিনটা স্বাভাবিকভাবেই কাটল। কাজ, কথা, কাগজ, স্ক্রিন। কিন্তু মাথার ভেতরে বারবার ভেসে উঠছিল একটা দৃশ্য—বেঞ্চে বসে থাকা মেঘলা, দুই হাতে চায়ের কাপ ধরা, চোখে প্রশ্ন অথচ মুখে কোনো অভিযোগ নেই।
এই মুখটাই ভয়ংকর।
কারণ অভিযোগ মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়।
নীরবতা মানুষকে টেনে নেয়।
সন্ধ্যায় সে হাঁটতে বেরোল। উদ্দেশ্যহীন। হাঁটতে হাঁটতে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল, যেখানে রাস্তার আলো কম, শব্দও কম। সে নিজেকে প্রশ্ন করল—সে কি আবার কারো জীবনে ঢুকে পড়ছে? নাকি সে শুধু দুজন মানুষের অপেক্ষাকে পাশাপাশি এনে বসিয়েছে?
ফোনটা বের করল। অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর টাইপ করল—
“কিছু জায়গা আছে, যেখানে মানুষ নিজের অজান্তেই সত্যি হয়ে যায়।”
পাঠিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর তিনটা ডট ভেসে উঠল। আবার মিলিয়ে গেল। আবার এল।
শেষমেশ একটা মেসেজ এল—
“আমি ওই জায়গাটাতেই দাঁড়াই।”
লোকটা চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি নেমে এল। এই শান্তিটাই সে ভয় পাচ্ছিল।
কারণ শান্তি মানেই জড়িয়ে পড়া।
রাতে ফিরে সে আর আলো জ্বালাল না। অন্ধকারেই বসে রইল। জানালার বাইরে দূরের ট্রেনের শব্দ এল—কেউ কোথাও যাচ্ছে, কেউ কোথাও ফিরছে।
সে বুঝল, এই গল্পটা এখন আর শুধু তার নয়। মেঘলাও এই গল্পে আছে। আর যেখানে দুজন থাকে, সেখানে একা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
সে জানে না, সে শেষ পর্যন্ত কতটা সাহসী হতে পারবে।
কিন্তু এটুকু সে জানে—
এইবার সে আর অদৃশ্য হয়ে যাবে না।
রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। শহরের শব্দ পাতলা হয়ে এসেছে, যেন সবাই ধীরে ধীরে নিজের নিজের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। লোকটা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। কাঁচে ভেসে থাকা নিজের প্রতিবিম্বটাকে সে আর এড়িয়ে যেতে পারল না।
এই মুখটা সে চেনে।
এই চোখদুটোও।
কিন্তু বহুদিন হলো—এই মুখটা আর কারো সামনে সত্যি হয়ে ওঠেনি।
সে হঠাৎ বুঝতে পারল, মেঘলার সঙ্গে তার গল্পটা আলাদা কারণ এখানে সে কিছু লুকোচ্ছে না—আবার সব খুলেও দিচ্ছে না। মাঝখানের এই জায়গাটাই সবচেয়ে স্পর্শকাতর। এখানেই মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, সে থাকবে নাকি সরে যাবে।
তার মনে পড়ল সেই শেষ দিনের কথা—যেদিন সে কাউকে বলেছিল,
“আমি থাকব।”
আর তারপরও থাকতে পারেনি।
সেই চলে যাওয়াটা ছিল নীরব। কোনো ঝগড়া নেই, কোনো নাটক নেই। শুধু একদিন আর ফোন ধরা হয়নি, একদিন আর দেখা হয়নি। মানুষ ভেবেছিল, সে ব্যস্ত। আসলে সে ভয় পেয়েছিল।
আজ বহুদিন পর, সেই ভয়টা আবার দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আজ সে দরজা বন্ধ করছে না।
ফোনটা আবার হাতে নিল। মেঘলার কোনো নতুন মেসেজ নেই। তবু সে বুঝতে পারছে—এই নীরবতার ভেতরে একটা সম্মতি আছে। জোর না করা, তাড়া না দেওয়া—এই ভাষাটা দুজনেই বুঝে নিয়েছে।
সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল। কিন্তু ঘুম এল না।
চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে—রেললাইন, বেঞ্চ, সন্ধ্যার আলো, আর এক মেয়ে যে নিজের কষ্টকে শব্দে ভাঙে না।
সে হঠাৎ খুব পরিষ্কার করে বুঝতে পারল—এই গল্পে সে আর শুধু “যে অপেক্ষা করে” নয়। সে ধীরে ধীরে “যে থাকে” হয়ে উঠছে।
এই থাকাটাই ঝুঁকি।
এই থাকাটাই আশ্বাস।
ভোরের দিকে যখন ঘুম এল, ঠিক তার আগমুহূর্তে সে নিজেকে একটা কথা বলল—
এইবার যদি কিছু ভাঙে,
তবু সে পালাবে না।
কারণ কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হলে
পুরোনো ভাঙনগুলো
আর ভয়ের মতো লাগে না—
ওগুলো তখন শেখা হয়ে যায়।
আর শহরের অন্য প্রান্তে, একই সময়,
মেঘলাও ঘুমোচ্ছিল না।
দুজনেই জানত না,
পরের বৃহস্পতিবার কী নিয়ে আসবে।



#পর্ব**৪

বৃহস্পতিবারটা এবার আর ধীরে আসেনি। যেন হঠাৎ করেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মেঘলা সকালে ঘুম ভেঙেই বুঝে গেল—আজকের দিনটা আলাদা। জানালার বাইরে আকাশ পরিষ্কার, অথচ বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার।
সে জানে না কেন, আজ একটু ভয় লাগছে।
ভয়টা লোকটাকে ঘিরে নয়,
ভয়টা নিজেকে ঘিরে।
রেললাইনের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নামছে। আজ বাতাসে ঠান্ডা বেশি, শব্দও কম। বেঞ্চটা দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে—আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে।
লোকটা।
মেঘলা থামল না। পা নিজেই এগিয়ে গেল। আজ আর অপেক্ষা করতে হলো না।
— “আজ আপনি দেরি করেননি,” লোকটা বলল।
— “আজ ভয় পাচ্ছিলাম,” মেঘলা উত্তর দিল, না ভেবেই।
লোকটা অবাক হলো না। যেন সে এই উত্তরটাই আশা করছিল।
দুজনেই বসে পড়ল বেঞ্চে। আজ মাঝখানের দূরত্বটা কম। হাত ছোঁয়া নয়, তবু ফাঁকা নয়।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
আজ সেই নীরবতা ভারী।
লোকটা প্রথম কথা বলল।
— “আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আমরা আসলে কী করছি?”
মেঘলা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
— “ভেবেছি। আর বুঝতে পারিনি।”
লোকটা হালকা হাসল।
— “আমিও না।”
ট্রেনের শব্দ দূর থেকে এল। আজও থামল না। আলো আর শব্দ একসঙ্গে ছুটে গেল।
মেঘলা হঠাৎ বলল,
— “আপনি নাম জানাতে চান না—আমি বুঝি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, না জানলে আমি আর সামনে এগোতে পারব না।”
লোকটা চুপ করে রইল। অনেকক্ষণ।
এই চুপ থাকাটার মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই—আছে সিদ্ধান্ত।
— “নাম জানলে মানুষ বাস্তব হয়ে যায়,” সে ধীরে বলল।
— “আর বাস্তব হলে?”
— “তখন চলে যাওয়াটা আর সহজ থাকে না।”
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
— “আপনি কি চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন?”
লোকটা মাথা নেড়ে বলল,
— “না। কিন্তু আমি ভয় পাই—আবার কাউকে ভেঙে দেব কি না।”
এই প্রথম, সে নিজের দুর্বলতার কথা বলল।
মেঘলার বুকের ভেতর কেমন একটা নরম কিছু ছড়িয়ে পড়ল।
— “ভাঙা মানুষ ভাঙতেই আসে না,” সে বলল। “ভাঙা মানুষ সাবধানে থাকে।”
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আপনি খুব সহজভাবে কঠিন কথা বলেন।”
মেঘলা হেসে ফেলল।
— “আপনিও চুপ করে অনেক কিছু বলে দেন।”
লোকটা এবার তার দিকে পুরোপুরি ঘুরে বসল।
— “আজ যদি নাম জানি,” সে বলল, “তাহলে আর পেছনে যাওয়ার রাস্তা থাকবে না।”
মেঘলা মাথা নিচু করল।
— “আমি পেছনে যেতে চাই না।”
এক মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর লোকটা বলল,
— “আমার নাম অনির্বাণ।”
নামটা বাতাসে ভেসে রইল। সাধারণ নাম, তবু অদ্ভুতভাবে ভারী।
মেঘলা খুব আস্তে বলল,
— “মেঘলা।”
অনির্বাণ নামটা কয়েকবার মনে মনে বলল, যেন শব্দটা মুখস্থ করছে।
— “আপনার নামের মতোই,” সে বলল, “আপনি পরিষ্কার নন। কিন্তু আটকে রাখেন।”
মেঘলা কিছু বলল না। চোখে জল আসেনি, কিন্তু চোখটা ভিজে উঠল।
এই নাম জানার মধ্যেই কিছু বদলে গেল।
লোকটা—না, অনির্বাণ—উঠে দাঁড়াল।
— “আজ আমি আপনাকে একটু দূর পর্যন্ত হেঁটে পৌঁছে দিতে চাই।”
মেঘলা অবাক হলো।
— “এটা কি নিয়ম ভাঙা?”
— “হ্যাঁ,” সে বলল, “আর নিয়ম ভাঙলেই তো গল্প এগোয়।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। প্রথমবার বেঞ্চের সীমা ছাড়িয়ে। রেললাইন পেছনে পড়ে রইল।
এই হাঁটাটা খুব সাধারণ। তবু মেঘলার মনে হলো—এই প্রথম কেউ তার জীবনে ঢুকছে, অনুমতি নিয়ে।
হাঁটতে হাঁটতে অনির্বাণ বলল,
— “সবকিছু একসঙ্গে এগোবে না।”
— “আমি জানি,” মেঘলা বলল।
— “তবু আপনি থাকবেন?”
— “থাকব,” সে বলল, “যতটা পারি।”
দূরে রাস্তার আলো। মানুষের শব্দ। বাস্তব জীবন।
অনির্বাণ থেমে গেল।
— “এখান পর্যন্তই,” সে বলল।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
— “আজ পর্যন্তই নয়।”
দুজনেই হালকা হাসল।
আজ কোনো প্রতিশ্রুতি হলো না।
কিন্তু নাম জানা হয়ে গেল।অনির্বাণ চলে যাওয়ার পর মেঘলা কিছুক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। রাস্তায় আলো আছে, মানুষ আছে, তবু তার মনে হচ্ছিল—সে এখনো রেললাইনের ধারে, সেই বেঞ্চটার কাছেই আছে। নাম জানার পর পৃথিবীটা হঠাৎ একটু বেশি বাস্তব হয়ে উঠেছে।
সে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। পায়ের শব্দে নিজের উপস্থিতি টের পাচ্ছে। এতদিন সে যেন কেবল ভেসে বেড়াচ্ছিল, আজ মাটি ছুঁয়ে হাঁটছে।
মোবাইলটা বের করল। স্ক্রিনে অনির্বাণের নাম সেভ করা নেই। নাম জানলেও, জায়গা দেওয়ার সাহস এখনো হয়নি। সে ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে দিল।
কিছু জিনিস তাড়াহুড়ো করলে ভেঙে যায়—
মেঘলা এটা জানে।
ঘরে ফিরেই সে জানালা খুলে দিল। বাইরে রাত গভীর, আকাশে অল্প তারা। বাতাসে একটা স্থিরতা। আজ আর বুকের ভেতর সেই পুরোনো অস্থিরতা নেই। আছে একটু ভয়, কিন্তু সেই ভয়টা পালাতে বলছে না—সাবধান হতে বলছে।
সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, খুব আস্তে—
“এবার আর অস্বীকার করছিস না।”
এই কথাটা কাউকে বলার ছিল না। নিজেকেই বলাই সবচেয়ে কঠিন।
অন্যদিকে, অনির্বাণ ধীরে ধীরে হাঁটছিল। সে ইচ্ছে করেই পেছনে তাকায়নি। কিছু দেখা পিছনে ফেলে আসতে পারলে তবেই সামনে যাওয়া যায়। আজ সে সেটাই করেছে—নিজের অভ্যাস ভেঙে।
তার বুকের ভেতরে নামটা ঘুরছিল—মেঘলা।
এই নামটা উচ্চারণ করতেই তার মনে হচ্ছিল, সে কারো কাছে কিছুটা দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই দায়টা ভয়ংকর, আবার প্রয়োজনীয়ও।
ফ্ল্যাটে ঢুকে সে আলো জ্বালাল না। অন্ধকারেই জুতো খুলে বসে পড়ল। ফোনটা বের করল। কন্ট্যাক্ট লিস্ট খুলে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর নতুন করে নাম টাইপ করল—
মেঘলা (বেঞ্চ)
হালকা হেসে ফেলল সে। নিজেকেই চিনতে পারছে না।
একটা মেসেজ টাইপ করল, আবার মুছে দিল। আবার লিখল, আবার মুছল। শেষে কিছুই পাঠাল না। কিছু কথা প্রথমে না বলাই ভালো।
রাতটা দুজনের কাছেই একটু আলাদা করে ধরা দিল। ঘুম এল দেরিতে। কিন্তু এই দেরি–ঘুমে অস্থিরতা নেই, আছে একধরনের প্রস্তুতি—যেন সামনে কিছু আসছে, আর তারা দুজনেই সেটা জানে।
পরদিন সকালে মেঘলা কাজে বেরোল। সবকিছু স্বাভাবিক। রাস্তা, বাস, কোলাহল। তবু তার মনে হচ্ছিল, ভেতরে কোথাও সে একটু বদলে গেছে। কাউকে বলা হয়নি, তবু সে আর আগের মতো নেই।
দুপুরে হঠাৎ ফোন কেঁপে উঠল।
একটা মেসেজ।
অনির্বাণ।
“আজ বেঞ্চে না। আজ শুধু জানতে চেয়েছিলাম—আপনি ঠিক আছেন তো?”
মেঘলা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। এই প্রশ্নটা সাধারণ, তবু ভেতরে কোথাও আলতো করে ছুঁয়ে গেল।
সে লিখল—
“ঠিক আছি। আজ একটু বেশি।”
কোনো ইমোজি নেই। কোনো বাড়তি কথা নেই। তবু এই দুই লাইনের ভেতরে অনেকটা থাকা আছে।
অনির্বাণ রিপ্লাই করল না। কিন্তু মেঘলা জানে—সে পড়েছে।
এইটুকুই যথেষ্ট।মেঘলা ফোনটা টেবিলে রেখে দিল। অনির্বাণ আর কোনো রিপ্লাই না করলেও তার মনে অস্বস্তি হলো না। এই না–কথা বলাটাও এখন একধরনের কথা হয়ে উঠেছে। সে জানে, সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে আসে না। কিছু উত্তর মানুষকে অপেক্ষা করতে শেখায়।
সন্ধ্যায় সে ছাদে উঠল। শহরের ওপর নেমে আসা অন্ধকারটা আজ আর ভারী লাগছে না। বাতাসে একটা হালকা উষ্ণতা। সে রেললাইনের দিকটা দেখতে পাচ্ছে না, তবু মনে হচ্ছে জায়গাটা এখন তার ভেতরেই আছে।
হঠাৎ তার মনে হলো—এই গল্পটা যদি এখানেই থেমে যেত? শুধু একটা নাম, কিছু কথা, আর কয়েকটা বৃহস্পতিবার—তাহলে কি খুব খারাপ হতো?
মেঘলা নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিল—
হতো।
কারণ সে আবার কিছু অনুভব করতে শিখেছে। আর অনুভব শেখার পর মানুষ আর আগের জায়গায় ফিরতে পারে না।
অন্যদিকে অনির্বাণ অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে ট্রাফিকে আটকে গেল। গাড়ির ভেতর বসে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। আলো, মানুষ, ব্যস্ততা—সব মিলেমিশে যাচ্ছে। অথচ তার মাথার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে—সে কি খুব বেশি কাছে আসছে?
সে জানে, তার অতীত তাকে সাবধান থাকতে শিখিয়েছে। কিন্তু সাবধানতা আর দূরত্ব এক জিনিস নয়। আজ সে সেটা প্রথমবার আলাদা করে বুঝতে পারছে।
ফ্ল্যাটে ঢুকে সে চুপচাপ বসে রইল। টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটা পুরোনো খামের ওপর। অনেকদিন আগে খুলেছিল, আবার বন্ধ করে রেখেছিল।
সে খামটা সরিয়ে রাখল। আজ নয়।
সব দরজা একদিনে খোলা যায় না।
রাত গভীর হলো। মেঘলা ঘুমোতে যাওয়ার আগে ডায়েরিটা আবার খুলল। আজ বেশি কিছু লিখল না। শুধু এক লাইনে থামল—
“নাম জানার পরও যদি মানুষ ধীরে হাঁটে, তবে সে পালাচ্ছে না—সে সম্মান করছে।”
কলম বন্ধ করল সে।
এই রাতটা দুজনের কাছেই শান্ত। কোনো অস্থিরতা নেই, নেই বড় কোনো সিদ্ধান্ত। শুধু একটা নীরব বোঝাপড়া—যেন তারা দুজনেই বুঝে গেছে, এই গল্পটা আর হঠাৎ নয়।
পরদিন সকালে মেঘলা রেললাইনের দিক দিয়ে গেল না। ইচ্ছে করেই। সব অভ্যাস প্রতিদিন পূরণ করলে তাদের গুরুত্ব কমে যায়। সে জানে, বেঞ্চটা অপেক্ষা করতে জানে।
দুপুরের দিকে অনির্বাণ একটা মেসেজ পাঠাল—
“আগামী বৃহস্পতিবার… যদি আপনার ঠিক থাকে।”
মেঘলা কোনো প্রশ্ন করল না। কোনো শর্তও না। শুধু লিখল—
“ঠিক আছে।”
দুটো শব্দ। তবু এই দুই শব্দের ভেতরেই পরের অধ্যায়টা লুকিয়ে আছে।
কারণ এখন তারা আর অচেনা নয়।
আবার পুরো চেনাও নয়।
এই মাঝখানের জায়গাটাই সবচেয়ে সত্যি।



#পর্ব***৫

বৃহস্পতিবারটা এবার আর শুধু দিন নয়—একটা প্রতিশ্রুতি। মেঘলা সকাল থেকেই সেটা অনুভব করছিল। ঘড়ির কাঁটার দিকে বারবার তাকানো, অকারণে জানালার বাইরে চোখ রাখা—সব মিলিয়ে দিনটা তার কাছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ লাগছিল।
আজ আর শুধু দেখা করার অপেক্ষা নয়।
আজ সে বুঝতে চাইছে—এই গল্পটা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
রেললাইনের দিকে যাওয়ার সময় মেঘলা নিজের মনকে বারবার বলছিল, খুব বেশি আশা করতে নেই। কিন্তু আশা এমন একটা জিনিস, যাকে বারণ করলেও সে কথা শোনে না।
বেঞ্চটার কাছে পৌঁছাতেই সে দেখল—অনির্বাণ আগেই এসেছে। আজ তার মুখে সেই চেনা শান্ত ভাব নেই। চোখে একটা চাপা ক্লান্তি।
— “আজ আপনি চুপচাপ,” মেঘলা বলল।
অনির্বাণ তাকাল। একটু হাসার চেষ্টা করল।
— “আজ একটু ভেতরে কথা বেশি চলছে।”
দুজন বসে পড়ল। আজ মাঝখানের দূরত্বটা নেই। তবু স্পর্শ নেই। এই অদ্ভুত সীমাটাই এখন তাদের।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর অনির্বাণ বলল,
— “আমি আপনাকে একটা কথা বলব ভেবেছি। কিন্তু জানি না বলা ঠিক হবে কি না।”
মেঘলা এক মুহূর্ত দেরি করল। তারপর বলল,
— “না বললেও আমি বুঝে যাব—কিছু একটা লুকানো আছে।”
এই সরল কথাটাই অনির্বাণকে থামিয়ে দিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আমার জীবনে একজন ছিল,” সে বলল ধীরে। “যাকে আমি ঠিক সময়টা দিতে পারিনি। কাজ, দায়িত্ব, ভয়—সব মিলিয়ে একদিন বুঝলাম, সে আর নেই।”
মেঘলা কোনো প্রশ্ন করল না। সে জানে, এই মুহূর্তে প্রশ্ন নয়—শোনা দরকার।
— “তারপর থেকে আমি কাউকে কাছে আসতে দিই না,” অনির্বাণ বলল। “কারণ কাছের মানুষকে হারানোর ভয়টা… খুব গভীর।”
মেঘলার বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা উঠল। সে বলল,
— “আপনি ভয় পান বলেই হয়তো আপনি খেয়াল রাখেন।”
অনির্বাণ তাকাল তার দিকে।
— “আপনি যদি একদিন বুঝতে পারেন, আমি হয়তো আবার ঠিকভাবে থাকতে পারব না—তবু কি আপনি থাকবেন?”
এই প্রশ্নটা হঠাৎ, কিন্তু সত্যি।
মেঘলা তাকিয়ে রইল রেললাইনের দিকে। ট্রেন আসছে না। শব্দও নেই। তারপর সে বলল,
— “আমি এমন কিছু চাই না, যা জোর করে টেনে নিতে হয়। কিন্তু আমি এমন কিছুও চাই না, যা ভয়ে ফেলে রাখা হয়।”
অনির্বাণের চোখ নামল। এই কথাটা তার ভেতরে কোথাও গিয়ে লাগল।
— “তাহলে আমরা কী করছি?” সে জিজ্ঞেস করল।
মেঘলা খুব শান্তভাবে বলল,
— “আমরা চেষ্টা করছি। আর চেষ্টা মানেই সব পরিষ্কার হবে—এমন নয়।”
আজ প্রথমবার তাদের মধ্যে মতের অমিল দাঁড়াল। ঝগড়া নয়, তবু ভারী।
অনির্বাণ উঠে দাঁড়াল।
— “আজ আমি একটু হাঁটব,” সে বলল। “একাই।”
মেঘলা থামাল না। শুধু বলল,
— “ঠিক আছে। কিন্তু হারিয়ে যাবেন না।”
এই কথাটা খুব সাধারণ, তবু অনির্বাণ থমকে গেল।
সে ঘুরে তাকাল।
— “আমি হারাতে চাই না,” সে বলল।
সে চলে গেল।
মেঘলা বেঞ্চে বসে রইল। আজ বুকের ভেতর সেই পুরোনো ভয়টা ফিরে এসেছে। কিন্তু আজ সে পালাচ্ছে না।অনির্বাণ চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরও মেঘলা বেঞ্চ থেকে উঠল না। রেললাইনের ওপাশে আলো জ্বলে উঠেছে, ট্রেনের শব্দ দূরে কোথাও মিলিয়ে গেছে। আজ জায়গাটা হঠাৎ খুব বড় লাগছে, আর সে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে।
সে ভাবছিল—মানুষ কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এমন সময়ে করে, যখন উত্তরগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ?
তার মনে পড়ল অনির্বাণের শেষ কথাটা—
“আমি হারাতে চাই না।”
এই কথাটার ভেতরে ভয় আছে, আবার ইচ্ছেও আছে। আর এই দুইয়ের মাঝখানেই মানুষ আটকে যায়।
মেঘলা ধীরে উঠে দাঁড়াল। আজ আর পেছনে তাকাল না। সে জানে, কিছু রাতে ফিরে তাকালে মন ভেঙে যায়।
ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করতেই নীরবতা তাকে জড়িয়ে ধরল। আজ সেই নীরবতা আর শান্ত নয়। সে সোফায় বসে পড়ল, জুতো না খুলেই। মাথার ভেতর কথাগুলো ঘুরছে—থাকবে তো? চেষ্টা করছি। হারাতে চাই না।
সে হঠাৎ বুঝল—অনির্বাণের ভয়টা আসলে ভালোবাসার আগের ধাপ। আর এই ধাপেই সবচেয়ে বেশি মানুষ ফিরে যায়।
মেঘলা উঠে জানালার ধারে দাঁড়াল। বাইরে আলো–আঁধারির শহর। তার মনে হলো, সে যদি আজ চুপ থাকে, এই গল্পটা হয়তো নিজে থেকেই ফিকে হয়ে যাবে। আর যদি কথা বলে—তাহলে ঝুঁকি আছে।
কিন্তু সে ঝুঁকি নিতে ক্লান্ত নয়।
ফোনটা হাতে নিল। অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর খুব ছোট একটা মেসেজ লিখল—
“আমি এখনো বেঞ্চে নেই। কিন্তু আমি এখানেই আছি।”
পাঠিয়ে দিল।
কোনো ব্যাখ্যা নেই। কোনো দাবি নেই।
অন্যদিকে, অনির্বাণ হাঁটছিল। রাস্তার আলো তার ছায়াকে লম্বা করে ফেলেছে। মনের ভেতর সে নিজের সঙ্গে লড়ছে—সে কি আবার সেই পুরোনো ভুল করবে? নাকি এবার অন্তত চেষ্টা করবে?
ফোনের ভাইব্রেশন তাকে থামিয়ে দিল।
মেসেজটা পড়েই সে চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতরের টানটা হঠাৎ ঢিলে হয়ে গেল। এই কথাটার ভেতরে কোনো চাপ নেই, তবু থাকার আশ্বাস আছে।
সে রিপ্লাই করল না। আজ নয়।
কিন্তু সে জানে—এই নীরবতার মানে পালানো নয়।
রাতে ঘুম এল দেরিতে দুজনেরই। কিন্তু এই দেরি–ঘুমে অস্থিরতা আর একরকম। যেন দুজনেই বুঝে গেছে—এই গল্পটা আর আগের মতো সহজ থাকবে না, কিন্তু এটাই তাকে সত্যি করে তুলছে।
পরদিন সকালে মেঘলা কাজে গেল। মুখে স্বাভাবিক ভাব, ভেতরে চাপা উত্তেজনা। দুপুরের দিকে হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
অনির্বাণ।
একটা মাত্র লাইন—
“সব উত্তর এখনই লাগে না। কিন্তু আমি চাই, আপনি থাকুন।”
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝল—এটা কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, তবু এটা একটা পদক্ষেপ।
সে লিখল—
“আমি আছি। কিন্তু অর্ধেক হয়ে নয়।”
অনির্বাণ অনেকক্ষণ পর রিপ্লাই করল—
“আমি চেষ্টা করব পুরো হতে।”
এই কথাটার ভেতরে ভয় আছে, তবু সরে যাওয়া নেই।
আর মেঘলা জানে—
সব সম্পর্ক শুরু হয় না নিশ্চিত হয়ে।
কিছু সম্পর্ক শুরু হয়
সাহস করে অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে।মেঘলা ফোনটা নামিয়ে রাখল। “আমি চেষ্টা করব পুরো হতে”—এই কথাটার ভেতরে সে কোনো নিশ্চয়তা খুঁজল না, খুঁজল শুধু ইচ্ছে। ইচ্ছে থাকলে মানুষ ধীরে বদলায়। আর বদল একদিনে হয় না—সে এটা জানে।
রাতে ডায়েরিটা খুলল সে। আজ লিখতে ইচ্ছে করছিল না, তবু কলমটা থামল না।
“সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে চাই না। আমি শুধু চাই—প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া না হোক।”
লেখা শেষ করে সে আলো নিভিয়ে দিল। আজ অন্ধকার তাকে ভয় দেখাচ্ছে না। অন্ধকারও যে অপেক্ষা করতে জানে, সে সেটা বুঝে গেছে।
অন্যদিকে অনির্বাণ বসে ছিল নিজের ঘরের মেঝেতে। চেয়ার, টেবিল—কিছুতেই বসতে ইচ্ছে করছিল না। তার মনে হচ্ছিল, দাঁড়িয়ে থাকলে পালানো সহজ, বসলে থাকতে হয়। আজ সে থাকতে চাইছে।
সে ভাবল, এত বছর ধরে সে নিজেকে নিরাপদ রাখার নামে কত কিছু থেকে দূরে রেখেছে। মানুষ, সম্ভাবনা, এমনকি নিজের সত্য থেকেও। মেঘলার কথাগুলো তার ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে—কোনো চাপে নয়, নীরবে।
সে উঠে দাঁড়িয়ে জানালা খুলল। রাতের বাতাস ঢুকল ঘরে। এই বাতাসে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, তবু শ্বাস নেওয়া যায়।
পরদিন সকালে অনির্বাণ একটা সিদ্ধান্ত নিল—ছোট, কিন্তু তার জন্য কঠিন। সে অফিসে ছুটি নিল। প্রথমবার নিজের জন্য, কারো থেকে পালানোর জন্য নয়।
দুপুরের দিকে সে মেঘলাকে মেসেজ পাঠাল—
“আজ বেঞ্চে আসব না। আজ নিজের কাছে থাকতে চাই। বৃহস্পতিবারে দেখা হবে।”
মেঘলা মেসেজটা পড়েই বুঝে গেল—এই না-আসাটার ভেতরে পালানো নেই। সে লিখল—
“ঠিক আছে। নিজের কাছে থাকাটাই তো সবচেয়ে দরকারি।”
এই কথোপকথনে কোনো রোমাঞ্চ নেই, তবু গভীরতা আছে। কারণ এখানে কেউ কাউকে টানছে না—দুজনেই নিজের জায়গা থেকে এগোচ্ছে।
বৃহস্পতিবার এল। আগের মতোই। রেললাইন, বেঞ্চ, সন্ধ্যা। মেঘলা একা গেল। আজ একা বসতেই হবে—এই সিদ্ধান্ত নিয়ে।
সে বসে রইল। আজ তার ভেতরে অপেক্ষা নেই, আছে প্রস্তুতি। যদি অনির্বাণ আসে—ভালো। না এলে—সে ভেঙে পড়বে না।
কিছুক্ষণ পর পায়ের শব্দ।
অনির্বাণ।
আজ তার চোখে ক্লান্তি নেই। আছে একটা স্থিরতা—যেটা হঠাৎ আসে না।
সে বসে পড়ল।
— “আজ আমি প্রশ্ন করতে আসিনি,” সে বলল।
— “আমিও না,” মেঘলা বলল।
নীরবতা এল। কিন্তু আজ এই নীরবতা চাপা নয়।
— “আমি জানি না ভবিষ্যৎ কেমন হবে,” অনির্বাণ বলল। “কিন্তু আমি জানি, আমি আর অর্ধেক হয়ে থাকতে চাই না।”
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
— “আমি তাড়াহুড়ো চাই না। আমি শুধু সৎ থাকা চাই।”
এই দুইটা কথা একসঙ্গে জায়গা করে নিল বেঞ্চে, সন্ধ্যায়, তাদের মাঝখানে।
আজ কোনো সিদ্ধান্ত লেখা হলো না।
কিন্তু একটা ভীতি ভাঙল।
আর সেটাই এই পর্বের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
কারণ কিছু গল্পে বড় ঘটনা লাগে না—
একটু সাহসই যথেষ্ট।



#পর্ব***৬

বেঞ্চ থেকে উঠে যাওয়ার পর দুজনেই বুঝেছিল—এই দেখা আগেরগুলোর মতো নয়। আজ কোনো অপ্রকাশিত কথা বাতাসে ঝুলে থাকেনি। তবু অদ্ভুতভাবে দুজনের বুকেই একটা চাপা আশঙ্কা রয়ে গেছে, যেন শান্তির ভেতরেই কিছু একটা এগিয়ে আসছে।
মেঘলা হাঁটছিল ধীরে। রাস্তায় আলো জ্বলছে, মানুষজন ফিরছে, শহর তার স্বাভাবিক গতিতেই আছে। অথচ তার মনে হচ্ছিল, নিজের ভেতরে সে একটা নতুন ঘরে ঢুকেছে—যেখানে আসবাব ঠিক করা হয়নি, কিন্তু জানালা খোলা।
সে ভাবছিল, সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন সময়টা আসলে শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ সৎ হতে শুরু করে। কারণ তখন আর নিজের পেছনে লুকোনোর জায়গা থাকে না।
পরদিন সকালে অফিসে ঢুকেই সে খবরটা পেল।
অনির্বাণের পুরোনো প্রজেক্ট টিম আবার ফিরছে। আর সেই টিমের সঙ্গে ফিরছে এক নাম—
ইরা।
নামটা পড়েই মেঘলার আঙুল থমকে গেল। ইরা—যার কথা অনির্বাণ একদিন বলেছিল, খুব কম কথায়। যে ছিল তার জীবনের “প্রায়-ছিল” অধ্যায়। পুরো হয়নি, তবু অসম্পূর্ণ বলেও শেষ হয়নি।
সারাদিন কাজে মন বসেনি মেঘলার। সে নিজেকে দোষ দিল না। কিছু নাম মানুষকে নাড়িয়ে দেয়—এটাই স্বাভাবিক।
সন্ধ্যার দিকে অনির্বাণ ফোন করল।
— “তুমি শুনেছ?”
— “হ্যাঁ,” মেঘলা বলল। গলায় কোনো অভিযোগ নেই, তবু সাবধানতা আছে।
— “আমি তোমাকে আগে বলতে চেয়েছিলাম,” অনির্বাণ বলল।
— “এখন বলছো—এটাই যথেষ্ট,” সে উত্তর দিল।
ফোন কেটে যাওয়ার পর অনির্বাণ দীর্ঘক্ষণ বসে রইল। তার ভেতরে ইরার ফিরে আসা মানে শুধু একজন মানুষ নয়—একটা সময়, একটা ভাঙা সিদ্ধান্ত, আর নিজের পুরোনো ভয়গুলো।
পরের দিন অফিসে ইরার সঙ্গে দেখা হলো।
সময় তাকে বদলেছে। ইরার চোখে এখন তাড়াহুড়ো নেই, আছে স্থিরতা।
— “অনির্বাণ,” সে হেসে বলল, “এত বছর পর আবার।”
— “হ্যাঁ,” অনির্বাণ বলল, “জীবন মাঝে মাঝে গোল হয়ে যায়।”
কথাবার্তা ভদ্র, পরিমিত। কিন্তু নীরবতার ফাঁকে ফাঁকে স্মৃতিরা মাথা তুলছে। একসঙ্গে কাজ, অসম্পূর্ণ কথা, বলা হয়নি এমন অনেক কিছু।
বিকেলে কফি ব্রেকে ইরা বলল,
— “তুমি আগের চেয়ে আলাদা।”
— “হতে শিখছি,” অনির্বাণ বলল।
এই কথাটা বলার সময় তার মাথায় মেঘলার মুখ ভেসে উঠল।
রাতে মেঘলার সঙ্গে দেখা হলো না। শুধু মেসেজ।
“আজ একটু ক্লান্ত। কাল কথা বলব।”
মেঘলা মেসেজটা পড়েই বুঝে গেল—ক্লান্তি শুধু শরীরের নয়।
সে উত্তর দিল—
“ঠিক আছে। নিজের সঙ্গে সৎ থেকো।”
এই একটা লাইনেই সে নিজের জায়গাটা পরিষ্কার করে দিল। সে টানবে না, আটকাবে না। কিন্তু অন্ধও থাকবে না।
রাতে মেঘলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবল—সে কি ঈর্ষা করছে? না কি ভয় পাচ্ছে?
উত্তরটা সহজ নয়।
কারণ সে জানে, অতীত এলে সবাই সমানভাবে শক্ত থাকে না।
অন্যদিকে অনির্বাণ শুয়ে আছে, ঘুম আসছে না। ইরার উপস্থিতি তাকে টেনে নিচ্ছে না, কিন্তু নিজের পুরোনো দ্বিধাগুলো সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
সে বুঝতে পারছে—এইবার সিদ্ধান্ত না নিলে, সে আবার অর্ধেক হয়ে যাবে।
আর মেঘলার কাছে সে অর্ধেক হয়ে থাকতে চায় না।পরের ক’দিন অফিসের পরিবেশ বদলে গেল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইরা আর অনির্বাণের আলোচনা, পুরোনো ফাইল, পুরোনো হাসি—সবই খুব স্বাভাবিক। তবু এই স্বাভাবিকতার ভেতরে একটা অতীতের ছায়া ছিল, যেটা শুধু অনির্বাণই টের পাচ্ছিল।
ইরা একদিন হঠাৎ বলল,
— “আমরা তো কোনোদিন ঠিক করে কথা শেষ করিনি, তাই না?”
অনির্বাণ চুপ করে রইল। সে জানে, কিছু কথা শেষ না হওয়াটাই তাদের শেষ হয়ে যাওয়া ছিল।
— “এখন শেষ করার দরকার নেই,” সে শান্ত গলায় বলল।
— “তুমি বদলে গেছ,” ইরা বলল।
— “হয়তো বদলাতে শিখছি,” অনির্বাণ উত্তর দিল।
এই কথোপকথনের পর অনির্বাণ বুঝে গেল—ইরার ফিরে আসা কোনো আবেগ জাগাচ্ছে না, কিন্তু আয়নার মতো তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে কী ছিল, আর এখন কী হতে চায়—এই দুইয়ের মাঝখানে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সেদিন সন্ধ্যায় মেঘলার সঙ্গে দেখা হলো। বেঞ্চে নয়, ছোট একটা চায়ের দোকানে। দুজনের মাঝখানে টেবিল, দুটো কাপে ধোঁয়া ওঠা চা।
মেঘলা আগে কথা বলল।
— “আমি জানি না সব কিছু,” সে বলল, “আর জানতেও চাই না জোর করে। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, তুমি অস্থির।”
অনির্বাণ প্রথমবার সরাসরি তাকাল তার চোখে।
— “আমি ভয় পাচ্ছি,” সে বলল।
— “কিসের?”
— “নিজেকে আবার হারিয়ে ফেলার।”
মেঘলা কোনো আশ্বাস দিল না। সে জানে, ভয় কাউকে দিলে যায় না।
— “আমি তোমাকে ধরে রাখব না,” সে বলল ধীরে। “কিন্তু আমি এমন কারো জন্য অপেক্ষাও করব না, যে নিজেই জানে না সে কোথায় দাঁড়িয়ে।”
এই কথাটা আঘাত নয়, সত্য।
অনির্বাণ চুপ করে রইল। এই চুপ থাকাটাই তার স্বীকারোক্তি।
সেই রাতে অনির্বাণ ইরাকে মেসেজ করল। ছোট, স্পষ্ট।
“তুমি আমার অতীতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আমি এখন অন্য জায়গায় আছি।”
ইরা রিপ্লাই দিল দেরিতে।
“আমি বুঝেছি। হয়তো আমাদের সময়টা এখানেই শেষ হওয়ার ছিল।”
এই মেসেজে কোনো নাটক নেই, তবু একটা অধ্যায় বন্ধ হলো।
অনির্বাণ ফোনটা নামিয়ে রাখল। বুকের ভেতরে হালকা শূন্যতা, কিন্তু স্বস্তি আছে। প্রথমবার সে কাউকে ছেড়ে গেল না—সে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
পরদিন মেঘলাকে সে শুধু একটা কথাই বলল—
— “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
মেঘলা তাকিয়ে রইল।
— “সিদ্ধান্তটা আমার জন্য না,” অনির্বাণ বলল, “নিজের জন্য।”
এই কথাটাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল।সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরের দিনগুলো অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। অনির্বাণ বুঝল—কিছু যুদ্ধ জিতে গেলে উল্লাস আসে না, আসে স্থিরতা। অফিসে ইরার সঙ্গে দেখা হলেও আর কোনো অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন হলো না। দুজনেই নিজেদের জায়গা বুঝে নিয়েছে।
মেঘলা দূর থেকে সব দেখছিল। সে কিছু জিজ্ঞেস করেনি, কিছু দাবি করেনি। এই নীরব বিশ্বাসটাই তার শক্তি—সে কাউকে প্রমাণ দিতে বাধ্য করে না।
এক সন্ধ্যায় হঠাৎ বৃষ্টি নামল। শহর ভিজে গেল, রাস্তা ফাঁকা হতে লাগল। মেঘলা হাঁটছিল ছাতা ছাড়াই। তার মনে হলো, আজ ভিজলে ক্ষতি নেই। ভেতরের জমে থাকা ভাবনাগুলোও ভিজে হালকা হবে।
অনির্বাণ তাকে দেখল দূর থেকে। ডাক দিল না সঙ্গে সঙ্গে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল—এই দেখাটার ভেতরে কোনো অধিকার নেই, আছে কৃতজ্ঞতা। সে এগিয়ে এসে বলল,
— “ভিজছো।”
মেঘলা হালকা হাসল।
— “হ্যাঁ। আজ ঠিক আছে।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটল। কথা কম, শব্দ কম। বৃষ্টির শব্দই যথেষ্ট ছিল।
একটু পর অনির্বাণ থামল।
— “আমি জানি, বিশ্বাস চাইলে কথা বলতে হয়,” সে বলল।
— “আর কথা বলার আগে নিজেকে পরিষ্কার করতে হয়,” মেঘলা শান্ত গলায় বলল।
এই বাক্য বিনিময়ে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, তবু একটা বোঝাপড়া আছে।
বৃষ্টি থামার সময় তারা আলাদা হলো। কোনো বিদায় নয়—শুধু জানা ছিল, আবার দেখা হবে। এই জানাটাই নতুন।
সেই রাতে মেঘলা ডায়েরিতে লিখল—
“অতীত এসেছে, দাঁড়িয়েছে, আর চলে গেছে। এবার বর্তমান নিজের মতো শ্বাস নিতে পারছে।”
অনির্বাণ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বুঝল—সে প্রথমবার পালায়নি। দাঁড়িয়ে থেকেছে। আর দাঁড়িয়ে থাকাটাই হয়তো তার সবচেয়ে বড় অর্জন।

#পর্ব**৭

অতীত বিদায় নেওয়ার পর সবাই হালকা হয় না।
কিছু মানুষ ভারী হয়—কারণ এবার তাদের সামনে আর কোনো অজুহাত নেই।
অনির্বাণ ঠিক এই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে ছিল।
মেঘলার সঙ্গে তার কথাবার্তা স্বাভাবিক, দেখা হচ্ছে, হাসিও ফিরেছে—কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে। এই দেয়াল মেঘলা তৈরি করেনি, অনির্বাণও ইচ্ছে করে বানায়নি। এটা তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ জানে—এবার ভুল করলে পালানোর জায়গা থাকবে না।
একদিন সন্ধ্যায় মেঘলা হঠাৎ বলল,
— “চলো, একটু হাঁটি।”
কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। শুধু হাঁটা।
এই প্রস্তাবটাই অনির্বাণকে অস্থির করে তুলল। কারণ হাঁটার সময় কথা বেরিয়ে আসে—যেগুলো সে এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলতে।
তবু সে রাজি হলো।
রাস্তার আলো, ভাঙা ফুটপাত, দোকান বন্ধ হওয়ার শব্দ—সব মিলিয়ে একটা সাধারণ সন্ধ্যা। কিন্তু দুজনের মাঝখানে কথার জায়গা খালি।
অনির্বাণ ভাঙল নীরবতা।
— “তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো?”
প্রশ্নটা হঠাৎ এল। প্রস্তুত ছিল না মেঘলা।
সে হাঁটা থামাল না।
— “বিশ্বাস কোনো প্রশ্নের উত্তর না,” সে বলল ধীরে। “এটা আচরণে বোঝা যায়।”
এই কথাটা অনির্বাণের বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে লাগল। সে বুঝল—মেঘলা তাকে পরীক্ষা করছে না, সে শুধু দেখছে।
— “আমি ভয় পাই,” অনির্বাণ বলল।
— “আমি জানি,” মেঘলা বলল।
— “কিসের?”
— “ভালোভাবে থাকার দায়িত্বের।”
অনির্বাণ থেমে গেল। এত স্পষ্ট করে কেউ আগে বলেনি।
— “আমি কি খুব কঠিন?” সে জিজ্ঞেস করল।
— “না,” মেঘলা মাথা নেড়ে বলল। “তুমি শুধু অভ্যস্ত নও।”
এই কথার পর আর কিছু বলার ছিল না।
পরের ক’দিন মেঘলা ইচ্ছে করেই একটু দূরে থাকল। ফোন কম করল, দেখা কম। এটা শাস্তি নয়—পরীক্ষাও নয়। সে শুধু জায়গা দিল। কারণ সে জানে, বিশ্বাস চাপ দিলে ভেঙে যায়।
এই দূরত্ব অনির্বাণকে অস্বস্তিতে ফেলল। সে বুঝল—এটাই সেই মুহূর্ত, যেখানে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়—চেষ্টা করবে, না আবার নিজেকে গুটিয়ে নেবে।
এক রাতে সে মেঘলার দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কলিং বেল টিপল না সঙ্গে সঙ্গে। কয়েক সেকেন্ড নিজের সঙ্গে লড়ল।
তারপর টিপল।
মেঘলা দরজা খুলল। বিস্ময় নেই, তাড়াহুড়ো নেই।
— “ভেতরে আসবে?”
— “না,” অনির্বাণ বলল। “আমি শুধু বলতে এসেছি।”
সে একদম সোজা কথাটা বলল—
— “আমি নিখুঁত নই। আমি ধীরে শিখি। কিন্তু আমি পালাতে চাই না।”
মেঘলা তাকিয়ে রইল। এই কথায় কোনো নাটক নেই, তবু সত্য আছে।
— “আমি থাকব,” সে বলল। “কিন্তু আমি নিজেকে ছোট করে না।”
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বলল,
— “আমি সেটাই চাই।”
এই কথার পর কেউ হাত ধরেনি, কেউ প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
কিন্তু এই মুহূর্তে দুজনেই বুঝে গেল—বিশ্বাস শব্দে হয় না, উপস্থিতিতে হয়।
দরজা বন্ধ হলো।
কিন্তু দেয়ালটা একটু ভাঙল।দরজা বন্ধ হওয়ার পর মেঘলা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত, অথচ গভীরে একটা কাঁপুনি। অনির্বাণের কথাগুলো নাটকীয় ছিল না—এই কারণেই সেগুলো ভয়ংকরভাবে সত্যি।
সে জানে, আজ যদি সে নরম হয়ে যায়, নিজেকে ছাড় দিতে শুরু করে—তাহলে আবার সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে যাবে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল, ভালোবাসলেও নিজের সীমা ছাড়াবে না।
পরের দিনগুলোতে তারা দেখা করল, কথা বলল—কিন্তু আগের চেয়ে আলাদা ভাবে। বেশি প্রশ্ন নেই, বেশি ব্যাখ্যা নেই। শুধু উপস্থিতি। অনির্বাণ সময়মতো ফোন করল, কথা রাখল, ছোট ছোট জায়গায় দায়িত্ব নিল—যেগুলো কেউ দেখে না, কিন্তু বিশ্বাস তৈরি করে।
মেঘলা খেয়াল করল, সে আর অপেক্ষা করছে না। সে শুধু দেখছে। আর দেখার ভেতরে অস্থিরতা নেই—এটাই তার নিজের পরিবর্তন।
এক সন্ধ্যায় হঠাৎ অনির্বাণ বলল,
— “কাল আমার পরিবারের সঙ্গে দেখা করবে?”
প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত। মেঘলা থেমে গেল। পরিবার মানে শুধু মানুষ নয়—একটা স্থায়ী জায়গা। সেখানে দাঁড়ানো মানে নিজেকে প্রকাশ করা।
— “তুমি নিশ্চিত?” সে জিজ্ঞেস করল।
— “না,” অনির্বাণ সৎভাবে বলল। “কিন্তু আমি লুকোতে চাই না।”
এই উত্তরেই মেঘলা রাজি হলো। কারণ নিশ্চিত না হয়েও কেউ যদি সামনে আনতে চায়—সেটা সাহস।
পরদিন বিকেলে তারা গেল। ছোট ফ্ল্যাট, সাধারণ মানুষ, উষ্ণতা কম, প্রত্যাশা বেশি। অনির্বাণের মা খুব কম কথা বললেন, কিন্তু চোখে চোখে অনেক প্রশ্ন। মেঘলা শান্ত ছিল। সে নিজেকে প্রমাণ করতে যায়নি।
ফিরে আসার পথে অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল,
— “কেমন লাগল?”
— “সত্যি?”
— “হ্যাঁ।”
— “চাপ ছিল,” মেঘলা বলল। “কিন্তু তুমি পাশে ছিলে।”
এই কথাটায় অনির্বাণ হালকা হাসল। আজ সে কিছু ঠিক করেছে—এই অনুভূতিটা নতুন।
কিন্তু রাতটা শান্ত থাকল না।
মেঘলার ফোনে একটা অচেনা নাম থেকে মেসেজ এল।
একটা লাইন, একটা প্রশ্ন—
“তুমি কি জানো, অনির্বাণ আসলে কতটা ভাঙা?”
মেঘলার হাত কেঁপে উঠল। নামটা পড়ল—ইরা।
সে রিপ্লাই দিল না। ফোন নামিয়ে রাখল। আজ কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না—এই প্রতিজ্ঞা করেছিল সে।
কিন্তু বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ঠিক এই জায়গাতেই—
যখন তৃতীয় একজন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
আর উত্তরটা তোমাকেই খুঁজে নিতে হয়।
মেঘলা জানালার বাইরে তাকাল। শহর একই আছে, কিন্তু তার ভেতরে কিছু একটা আবার দাঁড়িয়ে গেছে।
বিশ্বাস কি শুধু উপস্থিতি দিয়ে টেকে,
না কি তাকে প্রশ্নের মুখেও দাঁড়াতে হয়?

ইরার মেসেজটা স্ক্রিনে ভাসছিল। মেঘলা আর পড়ল না, তবু শব্দগুলো চোখের পাতার ভেতরে গেঁথে রইল। “ভাঙা”—এই শব্দটা মানুষ খুব সহজে ব্যবহার করে, কিন্তু ভাঙা মানেই কি অযোগ্য? এই প্রশ্নটা তাকে শান্ত হতে দিল না।
সে ফোনটা উল্টে রাখল। আজ কোনো উত্তর দেবে না—নিজেকে এইটুকু সময় দেবে।
রাতে অনির্বাণ ফোন করল। স্বাভাবিক গলায় কথা বলল—দিন কেমন গেল, কাজের চাপ, ছোটখাটো হাসি। মেঘলা শুনল। প্রশ্ন করল না। কারণ সে জানে, সব প্রশ্ন সঙ্গে সঙ্গে করলে বিশ্বাসের জায়গাটা সংকীর্ণ হয়ে যায়।
কল কাটার আগে অনির্বাণ বলল,
— “তুমি আজ একটু দূরে লাগছো।”
মেঘলা থামল। তারপর বলল,
— “দূরে না। আমি ভেতরে তাকাচ্ছি।”
এই উত্তরটা অনির্বাণ বুঝল পুরোটা না, তবু সম্মান করল।
— “ঠিক আছে,” সে বলল। “আমি এখানেই আছি।”
কল শেষ হলো। মেঘলা বুঝল—এই “এখানে থাকা”-টাই এখন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কোনো ব্যাখ্যা নয়, কোনো প্রতিরক্ষা নয়।
পরদিন সকালে মেঘলা ইরার মেসেজটা ডিলিট করে দিল। উত্তর না দিয়ে ডিলিট করা সহজ নয়—কিন্তু সে বুঝল, তৃতীয় জনের প্রশ্নে নিজের সম্পর্কের সংজ্ঞা লেখা যায় না।
সে সিদ্ধান্ত নিল—সে অনির্বাণকে প্রশ্ন করবে, কিন্তু অভিযোগ করবে না। মুখোমুখি। কারণ বিশ্বাস আড়াল থেকে বিচার করে না।
সন্ধ্যায় তারা দেখা করল। বেঞ্চে নয়—খোলা জায়গায়, আলোয়। মেঘলা সোজা বলল,
— “আমি একটা মেসেজ পেয়েছিলাম।”
অনির্বাণ চমকাল না।
— “ইরা?”
— “হ্যাঁ।”
এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর অনির্বাণ বলল,
— “আমি ভাঙা ছিলাম। এখনো পুরো নই। কিন্তু আমি সেটা লুকোইনি।”
এই স্বীকারোক্তিতে কোনো আত্মদয়া নেই। আছে দায়িত্ব।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
— “আমি নিখুঁত মানুষ খুঁজছি না। আমি এমন কাউকে চাই, যে ভাঙা থাকলেও সত্যি।”
অনির্বাণ ধীরে শ্বাস নিল। আজ সে নিজেকে ব্যাখ্যা করতে চায়নি—শুধু উপস্থিত ছিল।
দুজন পাশাপাশি বসে রইল। আজ কোনো সমাধান হয়নি। কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার হলো—তারা প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে না।
কারণ বিশ্বাসের শব্দ হয় না,
কিন্তু সে মুখোমুখি দাঁড়াতে জানে।



#পর্ব**৮

মেঘলা কিছুদিন ধরেই বুঝতে পারছিল—তার ভেতরে একটা নীরব চাপ জমছে। এই চাপ অনির্বাণের কোনো কথায় তৈরি হয়নি, বরং তৈরি হয়েছে নিজের প্রশ্নগুলো থেকে। বিশ্বাস মানে শুধু সামনে থাকা নয়, নিজের ভেতরেও দাঁড়িয়ে থাকা। আর এই দাঁড়িয়ে থাকাটার জন্য মাঝে মাঝে একা হতে হয়।
সে নিজেই দূরত্ব নিল।
ফোন ধরল না সঙ্গে সঙ্গে, দেখা কমাল। কোনো অভিযোগ ছাড়াই, কোনো ঘোষণা ছাড়াই। এই দূরত্ব কাউকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়—এটা নিজের শ্বাস ঠিক রাখার জন্য।
অনির্বাণ প্রথমে কিছু বুঝল না। তারপর বুঝল, আর সেই বোঝাটাই তাকে অস্থির করে তুলল। কারণ এবার দূরত্বটা এসেছে মেঘলার দিক থেকে—যে আগে সব কিছু সোজাসাপ্টা বলত।
সে মেসেজ পাঠাল,
“সব ঠিক তো?”
মেঘলা উত্তর দিল দেরিতে,
“ঠিক আছি। শুধু একটু সময় নিচ্ছি।”
এই “সময়” শব্দটা অনির্বাণকে ভয় দেখাল। কারণ সে জানে, সময় মানুষকে হয় কাছাকাছি আনে, নয়তো আলাদা করে দেয়।
সে চাপ দিল না। একটাও প্রশ্ন বাড়াল না। এই না-চাপ দেওয়াটাই তার নিজের জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল।
ক’দিন পর তারা একই জায়গায় পড়ল—কাকতালীয়ভাবে। পুরোনো লাইব্রেরির সামনে। দুজনেই থামল। কথা বলবে কি না—এই সিদ্ধান্ত নিতে কয়েক সেকেন্ড লাগল।
মেঘলাই আগে বলল,
— “চলে যাচ্ছিলাম।”
অনির্বাণ বলল,
— “আমি দাঁড়াতে পারি।”
এই দুই লাইনের মাঝখানে পুরো সম্পর্কের মানচিত্র ছিল।
তারা পাশাপাশি হাঁটল। দূরত্ব আছে, কিন্তু বিচ্ছেদ নয়।
— “আমি দূরে যাচ্ছি না,” মেঘলা বলল। “আমি শুধু বুঝতে চাই, আমি কোথায় দাঁড়িয়ে।”
— “আর আমি?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল।
— “তুমি তোমার জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকো,” সে শান্ত গলায় বলল। “আমি ফিরে এলে যেন তোমাকে পাই।”
এই কথাটায় কোনো নিশ্চয়তা নেই, তবু আশ্বাস আছে।
সেই রাতে অনির্বাণ একা বসে ভাবল। প্রথমবার সে বুঝল—ভালোবাসা মানে শুধু ধরে রাখা নয়, জায়গা করে দেওয়া।
সে সিদ্ধান্ত নিল, আর অপেক্ষা করবে না শুধু—সে নিজের কাজেও তা দেখাবে।
পরদিন সে মেঘলার জন্য কোনো মেসেজ পাঠাল না। কোনো নাটক করল না। সে শুধু নিজের অসম্পূর্ণ কাজগুলো গুছোতে শুরু করল—পরিবারের সঙ্গে কথা, নিজের ভয়গুলো নিয়ে থেরাপিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পুরোনো দায়গুলো মেটানো।
মেঘলা দূর থেকে এই পরিবর্তনগুলো টের পাচ্ছিল। কেউ তাকে জানাচ্ছিল না, কিন্তু উপস্থিতি বদলাচ্ছিল। এই বদল জোর করে করা নয়—এইটাই তাকে ভাবাল।
এক সন্ধ্যায় সে নিজেই মেসেজ পাঠাল,
“চা খেতে আসবে?”
অনির্বাণ পড়েই বুঝল—এই ডাক ফিরে আসার নয়, দেখার।
সে লিখল,
“আসব।”
এই এক শব্দেই অপেক্ষা, সম্মান, আর ইচ্ছা ছিল।অনির্বাণ ঠিক সময়েই এলো। বেশি আগে নয়, বেশি দেরিও নয়। এই ছোট হিসেবটাই মেঘলার চোখে পড়ল। দরজা খুলতেই দুজনেই একটু থমকে গেল—এতদিন পর কাছাকাছি দাঁড়ানো, অথচ হাত বাড়ানো নেই।
— “ভেতরে এসো,” মেঘলা বলল।
ঘরটা যেমন ছিল, তেমনই। কোনো সাজানো নাটক নেই। চা বসানো হলো টেবিলে। ধোঁয়া উঠছে, কিন্তু কথার ধোঁয়া নেই। কিছুক্ষণ শুধু চায়ের শব্দ, কাপ নামানোর আওয়াজ।
মেঘলা আগে কথা বলল।
— “আমি জানি, আমার দূরে থাকা সহজ ছিল না।”
— “হ্যাঁ,” অনির্বাণ সৎভাবে বলল, “কিন্তু দরকার ছিল।”
এই কথাটা মেঘলাকে চমকে দিল। সে আশা করেনি অনির্বাণ এমন করে বলবে।
— “আমি বুঝেছি,” অনির্বাণ বলল, “তুমি আমাকে শাস্তি দাওনি। তুমি নিজেকে সময় দিয়েছো।”
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
— “আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাইনি, কাউকে ভালোবাসতে গিয়ে।”
এই বাক্যটা ঘরের ভেতর স্থির হয়ে রইল। অনির্বাণ বুঝল—এই জায়গাটাই সবচেয়ে স্পর্শকাতর।
— “আমি কিছু বদলাচ্ছি,” সে বলল ধীরে। “দেখানোর জন্য না। না বদলালে আমি নিজেই টিকতে পারছিলাম না।”
মেঘলা কোনো বাহবা দিল না। সে জানে, বদল কথা শুনে যাচাই করা যায় না।
— “আমি দেখছি,” সে শুধু বলল। “আর দেখতেই চাই।”
এই কথাটায় অনির্বাণ হালকা নিঃশ্বাস ফেলল। আজ তাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়নি, শুধু উপস্থিত থাকতে হয়েছে।
চা শেষ হলো। সন্ধ্যা গাঢ় হলো। অনির্বাণ উঠে দাঁড়াল।
— “আমি যাব,” সে বলল।
— “থাকতে বলব না,” মেঘলা শান্ত গলায় বলল।
দুজনেই হাসল—এই হাসির ভেতরে কোনো কষ্ট নেই।
দরজার কাছে অনির্বাণ থামল।
— “তুমি যদি আবার দূরে যাও,” সে বলল, “আমি দাঁড়িয়ে থাকব।”
— “আর আমি যদি ফিরে আসি,” মেঘলা বলল, “আমি দেখতে চাই—তুমি এখনো এখানেই।”
এই দুই লাইনে কোনো প্রেমের ঘোষণা নেই, তবু দায়িত্ব আছে।
দরজা বন্ধ হলো।
কিন্তু এবার আলাদা হওয়ার শব্দটা ভারী লাগল না।
মেঘলা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল অনির্বাণ ধীরে হাঁটছে। হঠাৎ তার মনে হলো—দূরত্ব সব সময় আলাদা করে না, কখনো কখনো মানুষকে ঠিক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
আর অনির্বাণ হাঁটতে হাঁটতে বুঝল—
এইবার যদি সে পড়ে,
তাকে একাই উঠে দাঁড়াতে হবে।
কারণ পাশে থাকার যোগ্য হতে গেলে
নিজের পায়ে দাঁড়ানো শিখতেই হয়।
রাতটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ছিল। মেঘলা বিছানায় শুয়েও ঘুমোতে পারছিল না, আবার অস্থিরও লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, অনেকদিন পর নিজের সঙ্গে তাল মিলেছে। দূরত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্তটা তাকে হালকা করেছে—এই হালকাতেই সে বুঝল, সে আর ভয় থেকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না।
সে জানে, আজ অনির্বাণকে যেতে দেওয়াটা সহজ ছিল না। কিন্তু সহজ না হওয়াটাই প্রমাণ—এটা সঠিক।
অন্যদিকে অনির্বাণ হাঁটতে হাঁটতে থামল একবার। পকেট থেকে ফোনটা বের করল, আবার ঢুকিয়ে রাখল। আজ কোনো মেসেজ পাঠানোর দরকার নেই—এই অনুভূতিটা তার জন্য নতুন। আগে সে নিশ্চিত হতে চাইত, আজ সে অপেক্ষা করতে শিখছে।
সে বুঝল, দূরত্বে থাকা মানে অনুপস্থিত থাকা নয়। দূরত্বে থেকেও দায়িত্ব নেওয়া যায়—এই পাঠটাই সে আজ শিখেছে।
পরদিন সকালে মেঘলা জানালার পর্দা সরাতেই রোদ ঢুকে পড়ল। সে হঠাৎ খেয়াল করল—ভেতরে কোথাও একটা তাড়াহুড়ো নেই। সম্পর্কের নাম কী, ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে—এই প্রশ্নগুলো আজ চুপ করে আছে।
সে চা বানাতে বানাতে ভাবল,
ভালোবাসা যদি আসে,
তবে এই শান্ত জায়গা দিয়েই আসুক।
আর অনির্বাণ অফিসের পথে হাঁটতে হাঁটতে বুঝল—এইবার সে কিছু প্রমাণ করার জন্য ছুটছে না। সে শুধু নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, ঠিকভাবে।
এই অধ্যায়ে কেউ জিতল না, কেউ হারল না।
শুধু দুজনেই একটু বেশি নিজের হলো।


#পর্ব***৯

দূরত্বের পর যে শান্তি আসে, তা সব সময় স্থায়ী হয় না।
কখনো কখনো সেই শান্তিই দায়িত্বের ডাক দেয়।
অনির্বাণ সেটা টের পেল এক সোমবার সকালে। অফিসে ঢুকেই খবরটা এলো—তার টিমের গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টটা হঠাৎ বাতিলের মুখে। ভুল সিদ্ধান্ত, অসম্পূর্ণ কাজ, আর কয়েকটা অস্বীকার করা সতর্কতার ফল। এই প্রজেক্টটা তার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। হারালে শুধু কাজ যাবে না, বিশ্বাসও যাবে।
আগের অনির্বাণ হলে হয়তো পিছিয়ে যেত। দোষ ভাগ করে নিত, সময় চাইত, কিংবা চুপ করে সরে দাঁড়াত।
কিন্তু আজ সে দাঁড়িয়ে রইল।
সে মিটিং ডাকল। নিজের ভুলগুলো নিজেই বলল—কার কোথায় দায়, কোন সিদ্ধান্ত সে নেয়নি সময়মতো। কোনো নাটক নেই, কোনো আত্মদয়া নেই। শুধু দায়িত্ব।
এই দায়িত্ব নেওয়াটা সহজ ছিল না। মুখের ভেতর শুকিয়ে আসছিল, তবু সে থামেনি।
সেই দিন সন্ধ্যায় মেঘলার সঙ্গে কথা হয়নি। ইচ্ছে করেও সে মেসেজ পাঠায়নি। আজ সে জানে—সব সময় ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার নেই, কিছুদিন কাজ করাই যথেষ্ট।
মেঘলা দূর থেকে খবরটা পেল। কারো কাছ থেকে, কারো কথার ফাঁকে। সে নিজে কিছু জিজ্ঞেস করল না। কারণ সে বুঝতে পারছিল—এইবার অনির্বাণ নিজের লড়াই নিজেই লড়ছে।
পরের কয়েকদিন অনির্বাণের জীবন শুধু কাজ আর দায়ে ভরে গেল। দেরি করে ফেরা, ক্লান্ত চোখ, কিন্তু একটাও অভিযোগ নেই। সে জানে, যদি সে আজ নিজেকে সামলাতে না পারে, কাল কাউকে পাশে দাঁড়ানোর কথা বলার অধিকারও তার থাকবে না।
এক রাতে অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে সে থামল সেই পুরোনো বেঞ্চের সামনে। অনেকদিন পর। বসেনি। শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
সে বুঝল—এই জায়গাটা তাকে কিছু দেয়নি, বরং সে এখানেই শিখেছে কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
মেঘলা সেই রাতে নিজেই ফোন করল।
— “তুমি ঠিক আছো?”
অনির্বাণ একটু হেসে বলল,
— “ক্লান্ত। কিন্তু সরে যাইনি।”
এই উত্তরটাই মেঘলার বুকের ভেতর কোথাও শান্তি এনে দিল।
— “আমি জানি,” সে বলল। “তুমি এখন কাজ দিয়ে কথা বলছো।”
কয়েকদিন পর সিদ্ধান্ত এলো। প্রজেক্ট পুরো বাতিল হলো না, তবে নতুন করে শুরু করতে হবে—অনির্বাণের নেতৃত্বে। এটা শাস্তি নয়, পরীক্ষা।
সে খবরটা প্রথম মেঘলাকে জানাল না। আগে নিজের কাছে গ্রহণ করল।
সেদিন রাতে তারা দেখা করল। কোনো বিশেষ জায়গায় নয়। শুধু হাঁটতে হাঁটতে।
— “আমি ব্যস্ত থাকব,” অনির্বাণ বলল।
— “আমি জানি,” মেঘলা বলল।
— “তবু আমি থাকছি।”
— “আমি দেখছি,” সে শান্ত গলায় বলল।
এই “দেখছি”-টাই এখন সবচেয়ে বড় কথা।নতুন করে শুরু হওয়া প্রজেক্টটা অনির্বাণের সমস্ত সময় গ্রাস করে নিল। সকাল, দুপুর, রাত—সব এক হয়ে গেল। মিটিংয়ের পর মিটিং, হিসেবের পর হিসেব। মাঝে মাঝে সে নিজের প্রতিফলনটা কাচে দেখে থমকে যেত—চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে পিছু হটার কোনো রেখা নেই।
এই ক্লান্তির মাঝেও সে একটা কাজ নিয়ম করে করত।
রাতে বাড়ি ফিরে নিজের ডায়েরিতে দুটো লাইন লিখত—আজ কী শিখল, আর আজ কোথায় ভুল করল।
এই অভ্যাসটা সে মেঘলাকে দেখাতে শুরু করেনি, কাউকে জানায়নি। নিজের জন্যই।
মেঘলা দূরে থেকেও পরিবর্তনটা টের পাচ্ছিল। অনির্বাণ আর কথা দিয়ে আশ্বস্ত করছে না, কিন্তু হঠাৎ হারিয়ে যাচ্ছে না। সপ্তাহে একদিন ঠিক করে ফোন করছে, দেখা হলে সময় নিয়ে কথা বলছে। এই স্থিরতাই তাকে ভাবাচ্ছিল—এই মানুষটা কি সত্যিই বদলাচ্ছে?
এক সন্ধ্যায় অনির্বাণ হঠাৎ অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা হাসপাতালে গেল। তার বাবার শরীরটা কয়েকদিন ধরে ভালো যাচ্ছিল না। আগে হলে সে কাজের অজুহাত দিত। আজ দেয়নি।
হাসপাতালের করিডরে বসে সে বুঝল—জীবনের সব দায় একসঙ্গে সামলানো যায় না, কিন্তু যেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছিল, সেগুলোকে সামনে আনতেই হয়।
রাতে সে মেঘলাকে মেসেজ করল,
“আজ একটু দেরি হবে। বাবার কাছে আছি।”
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে কল করল না। শুধু লিখল,
“ঠিক জায়গায় আছো।”
এই তিনটা শব্দ অনির্বাণের বুকের ভেতর কোথাও নরম হয়ে গেল। আজ তাকে কেউ তাড়া দিচ্ছে না, আবার একাও ফেলে দিচ্ছে না।
ক’দিন পর প্রজেক্টের প্রথম রিভিউ হলো। সবকিছু নিখুঁত হয়নি, কিন্তু স্পষ্ট ছিল—অনির্বাণ পালাচ্ছে না। সিনিয়ররা কিছু বলল না, শুধু বলল—“এভাবে চলতে থাক।”
সেই সন্ধ্যায় সে মেঘলার সঙ্গে দেখা করল। হাঁটছিল তারা, আগের মতোই। কিন্তু আজ অনির্বাণ একটু থেমে বলল,
— “আমি ভয় পাই এখনো।”
— “কিসের?”
— “সব ঠিক করে ফেললেও, যদি আমি যথেষ্ট না হই?”
মেঘলা তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
— “যথেষ্ট হওয়া কোনো শেষ লাইনের মতো নয়। এটা প্রতিদিনের চেষ্টা।”
এই কথাটা অনির্বাণ নিজের ভেতরে নিয়ে নিল। আজ সে বুঝল—মেঘলা তাকে তুলনা করছে না, মূল্যায়ন করছে।
হাঁটার শেষে সে বলল,
— “আমি জানি না শেষ কোথায় যাবে।”
— “আমি জানি,” মেঘলা শান্ত গলায় বলল, “তুমি মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছো।”
এই দাঁড়িয়ে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় ব্যাপার।সেই রাতের পর অনির্বাণ আর নিজেকে খুব বেশি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল না। সে বুঝে গেছে—সব উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না। কিছু উত্তর সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়।
কাজের চাপ একটু কমতেই সে প্রথম যেটা করল, তা হলো নিজের জন্য একদিন ছুটি নেওয়া। কোনো বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা নয়, কোনো সামাজিক উপস্থিতিও নয়। শুধু নিজের সঙ্গে থাকা। এই সিদ্ধান্তটাই তার আগের জীবনে সবচেয়ে অচেনা ছিল।
সে সকালে দেরিতে উঠল। জানালা খুলে আলো ঢুকতে দিল। নিজের ঘরটাকে প্রথমবার ঠিক করে দেখল—যেন এতদিন এই ঘরেও সে অতিথি ছিল। আলমারির ভেতর থেকে পুরোনো কাগজ, নোট, অর্ধেক লেখা ভাবনা বেরিয়ে এল। সে কিছু ছিঁড়ল না, কিছু রেখে দিল। অতীতকে মুছে নয়, জায়গা করে বিদায় দেওয়াই আজ তার শেখা।
বিকেলে মেঘলার কথা মনে পড়ল। ফোন করল না। শুধু মনে মনে ভাবল—সে এখন কেমন আছে? এই ভাবনাটায় কোনো দাবি নেই, আছে দায়িত্ববোধ।
অন্যদিকে মেঘলা নিজের মতো করে দিন কাটাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, অনির্বাণের অনুপস্থিতি আর আগের মতো ভারী লাগে না। কারণ এই অনুপস্থিতিতে অস্থিরতা নেই। সে জানে—এটা পালানো নয়।
সন্ধ্যার দিকে অনির্বাণ একটা ছোট মেসেজ পাঠাল,
“আজ নিজেকে একটু গুছোচ্ছি।”
মেঘলা পড়েই বুঝে গেল—এই বাক্যটা নতুন অনির্বাণের। সে উত্তর দিল,
“সময় নাও। আমি এখানেই আছি।”
এই “এখানে থাকা” কোনো বন্ধন নয়, একটা অবস্থান।
রাতে অনির্বাণ শুয়ে ভাবল—সে এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু সে আর ভাঙার ভয়ে নিজেকে লুকোচ্ছে না। এই উপলব্ধিটাই তার সবচেয়ে বড় অগ্রগতি।
আর মেঘলা বুঝল—সে আর অপেক্ষা করছে না ফলাফলের জন্য। সে শুধু দেখছে চেষ্টা। আর এই দেখাটার ভেতরে ক্লান্তি নেই।
এই পর্বে কেউ কাউকে জেতেনি।
কেউ হারেওনি।
শুধু দুজনেই বুঝেছে—
ভালোবাসা যদি টিকে থাকে,
তা কাজের ভেতর দিয়েই টিকে থাকে।




#পর্ব***১০
কিছু কথা আছে, যেগুলো কাজ দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না।
সেগুলো একদিন সামনে এসে দাঁড়ায়—নিরুপায়ভাবে।
অনির্বাণ সেটা বুঝেছিল। আর তাই সে আর অপেক্ষা করেনি।
এক সন্ধ্যায় সে মেঘলাকে মেসেজ পাঠাল—
“আজ দেখা দরকার। হাঁটতে না, বসে কথা বলব।”
মেঘলা পড়েই বুঝে গেল—আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সে লিখল—
“ঠিক আছে।”
তারা দেখা করল ছোট একটা ক্যাফেতে। আলো কম, শব্দ কম। এমন জায়গা, যেখানে কথা গোপন থাকে না, কিন্তু চাপা পড়ে না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল দুজন। আজ এই নীরবতাটা অস্বস্তিকর নয়—বরং প্রস্তুতির মতো।
অনির্বাণই শুরু করল।
— “আমি বদলাচ্ছি, এটা তুমি দেখছো। কিন্তু আমি জানি, বদলটাই সব না।”
মেঘলা তাকিয়ে রইল। কোনো মাথা নেড়ে সম্মতি নেই, কোনো অস্বীকৃতিও নেই।
— “আমি ভয় পাই,” অনির্বাণ বলল। “এখনো। কিন্তু ভয়টা আর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে চাই না।”
মেঘলা ধীরে বলল,
— “আমি ভয় পাই না তোমার ভয়কে। আমি ভয় পাই অস্পষ্টতাকে।”
এই কথাটা কফির কাপের মতো টেবিলে স্থির হয়ে রইল।
— “তুমি কী চাও?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল। আজ প্রশ্নটা এড়াল না।
— “আমি পরিষ্কার জায়গা চাই,” মেঘলা বলল। “থাকা মানে থাকা, না থাকা মানে না থাকা। মাঝখানে ঝুলে থাকা না।”
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই জায়গাটাই সে এড়িয়ে চলেছিল এতদিন।
— “আমি তোমাকে ভালোবাসি কি না—এই প্রশ্নটা এখনো আমি বড় করে বলিনি,” সে বলল।
— “আমি শব্দ চাই না,” মেঘলা শান্ত গলায় বলল। “আমি দায়িত্ব চাই।”
এই দায়িত্ব শব্দটা অনির্বাণকে কাঁপিয়ে দিল। কারণ সে জানে—এটা বলা সহজ, নেওয়া কঠিন।
— “আমি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না যে আমি নিখুঁত হব,” সে বলল।
— “আমি নিখুঁত মানুষ চাইও না,” মেঘলা বলল। “আমি চাই, তুমি যদি ভেঙে পড়ো—আমাকে বাদ দিয়ে না পড়ো।”
এই এক লাইনে সব জমে থাকা কথা খুলে গেল।
অনির্বাণ প্রথমবার কোনো ঢাল ছাড়াই বলল,
— “আমি চাই তুমি থাকো। আজ, কাল—ভবিষ্যতের নাম না দিয়ে। কিন্তু সত্যি করে।”
মেঘলা চোখ নামাল। এই কথার ভেতরে দাবি নেই, তাড়াহুড়ো নেই—শুধু উপস্থিতির অনুরোধ।
— “আমি থাকব,” সে বলল ধীরে। “কিন্তু আমি নিজেকে হারাব না।”
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বলল,
— “এই শর্তটাই সবচেয়ে ন্যায্য।”
ক্যাফে থেকে বেরোনোর পর রাতটা আর হালকা লাগল না। বাতাসে একটা অদ্ভুত স্থিরতা ছিল—যেন শহরটাও তাদের কথাগুলো শুনে চুপ করে গেছে।
দুজনেই হাঁটছিল পাশাপাশি, কিন্তু মাথার ভেতর চলছিল আলাদা আলাদা যুদ্ধ।
অনির্বাণ বুঝতে পারছিল—আজ সে আর আগের জায়গায় নেই। আজ সে শুধু নিজেকে বোঝায়নি, কাউকে বোঝানোর সাহসও করেছে। এই সাহসটাই তাকে একটু ভারী করে তুলেছিল। দায়িত্বের ওজন এমনই হয়—হালকা নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়।
মেঘলা হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল, সে আজ প্রথমবার কোনো কথা চেপে যায়নি। সে দাবি করেনি, আবার নিজেকেও ছোট করেনি। এতদিন পরে তার ভেতরে একটা শান্ত আত্মসম্মান জন্ম নিয়েছে—যেটা কোনো সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।
একটা মোড়ে এসে তারা থামল।
অনির্বাণ বলল,
— “আমি জানি না সামনে কী হবে। কিন্তু আজ যেটুকু বলেছি, সেটা ফেরত নিতে পারব না।”
মেঘলা তাকাল তার দিকে। চোখে অভিযোগ নেই, উত্তেজনাও নেই।
— “আমি সেটাই চেয়েছিলাম,” সে বলল। “ফেরত নেওয়া যায় এমন কথা আমি আর চাই না।”
এই কথার ভেতরে কোনো নাটক নেই, আছে স্থিরতা।
অনির্বাণ একটু হাসল। ক্লান্ত কিন্তু সত্যি হাসি।
— “তুমি জানো,” সে বলল, “আমি আগে ভাবতাম—ভালোবাসা মানে নিজেকে হারানো। আজ বুঝছি, ভালোবাসা মানে নিজেকে লুকানো বন্ধ করা।”
মেঘলা কোনো উত্তর দিল না। কিছু কথা উত্তর চায় না—শুধু গ্রহণ চায়।
তারা বিদায় নিল। আজ কোনো “কাল কথা হবে” নেই, কোনো প্রতিশ্রুত সময়ও নেই। কিন্তু এই বিদায়টা শূন্য ছিল না।
ঘরে ফিরে অনির্বাণ লাইট জ্বালাল না। অন্ধকারেই বসে রইল কিছুক্ষণ। আজ অন্ধকার তাকে ভয় দেখাচ্ছে না। বরং পরিষ্কার লাগছে। সে বুঝল—সে আর দৌড়চ্ছে না, দাঁড়িয়ে আছে।
মেঘলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শহরের আলো দেখল। তার মনে হলো—সব আলো একসাথে জ্বললে যেমন চোখে লাগে, তেমনই সম্পর্কও একসাথে সব চাইলে ভেঙে পড়ে। ধীরে জ্বলা আলোই টিকে থাকে।
এই রাতে কেউ সিদ্ধান্ত নেয়নি চূড়ান্তভাবে।
কিন্তু দুজনেই বুঝেছে—
আর পেছনে ফেরার রাস্তা নেই।
কারণ সত্য একবার মুখোমুখি হলে,
তাকে অস্বীকার করা যায় না—
শুধু গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা যায়।




#পর্ব**১১

কিছু সিদ্ধান্ত চিৎকার করে আসে না।
সেগুলো আসে খুব সাধারণ এক সকালে, যখন চারপাশে সব স্বাভাবিক।
অনির্বাণ সেই সকালে ঘুম ভাঙতেই বুঝেছিল—আজ আর ভাবার দিন নয়। আজ বেছে নেওয়ার দিন।
সে অফিসে যায়নি। ফোন বন্ধ করেনি, শুধু অপ্রয়োজনীয় শব্দগুলো থামিয়ে রেখেছিল। মাথার ভেতরে যে কথাগুলো ঘুরছিল, সেগুলোকে সে প্রথমবার পালাতে দেয়নি।
মেঘলার কথাই বারবার মনে পড়ছিল। তার দাবি, তার শান্ত গলা, তার সেই এক লাইন—
“আমি নিজেকে হারাব না।”
এই কথাটা অনির্বাণকে ভেঙেও দিয়েছিল, আবার দাঁড় করিয়েও।
দুপুরের দিকে সে নিজেই মেঘলাকে ফোন করল।
— “আজ দেখা করতে পারব?”
— “হ্যাঁ,” মেঘলা বলল। একটুও দেরি না করে।
তারা দেখা করল সেই জায়গায়, যেখানে আগে বহুবার কথা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। আজ জায়গাটা বদলায়নি, কিন্তু মানুষ দুজন বদলে গেছে।
অনির্বাণ কথা শুরু করল সরাসরি।
— “আমি তোমার কাছে এসেছি সিদ্ধান্ত নিয়ে।”
মেঘলা চুপ করে শুনছিল। আজ সে কোনো ইঙ্গিত চাইছে না, কোনো প্রতিশ্রুতি খুঁজছে না। সে শুধু সত্য চায়।
— “আমি বুঝেছি,” অনির্বাণ বলল, “আমি যদি তোমার জীবনে থাকি, তাহলে অর্ধেক হয়ে থাকতে পারব না। আর যদি পুরোটা না পারি—তাহলে আমাকে সরে যেতে হবে।”
এই কথায় মেঘলার বুক কেঁপে উঠল, কিন্তু চোখ ভিজল না। কারণ সে জানে—এই কথাটা নিষ্ঠুর হলেও সৎ।
— “আমি তোমাকে বেছে নিচ্ছি,” অনির্বাণ বলল। “ভয়ের সঙ্গে, অসম্পূর্ণতা নিয়ে, কিন্তু পালানো ছাড়া।”
এক মুহূর্ত সময় থেমে রইল।
মেঘলা গভীর শ্বাস নিল।
— “আমি তোমাকে বেছে নিচ্ছি না,” সে বলল ধীরে।
অনির্বাণের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে গেল।
মেঘলা কথা শেষ করল—
— “আমি আমাদের বেছে নিচ্ছি। শর্তসহ, সীমা নিয়ে।”
এই পার্থক্যটাই ছিল আসল ক্লাইম্যাক্স।
— “তুমি যদি আমার পাশে থাকো,” সে বলল, “তবে নিজের জায়গা রেখে থাকবে। আর আমিও তাই করব।”
অনির্বাণ চোখ নামাল। এই সিদ্ধান্তে রোমান্টিক ঝাঁঝ নেই, কিন্তু আছে বাস্তবের মাটি।
— “আমি রাজি,” সে বলল।
আজ কেউ হাঁটু গেড়ে বসেনি।
আজ কেউ কাউকে উদ্ধার করেনি।
আজ দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলেছে—
“আমরা একসাথে থাকব, কিন্তু আলাদা হয়ে।
****
সব শেষ হওয়ার আগে আসলে কিছুই শেষ হয় না—শুধু তার নাম বদলায়।
অনির্বাণ আর মেঘলা সিদ্ধান্তের পর আলাদা করে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তারা কাউকে জানানোর প্রয়োজন বোধও করেনি। কারণ এই সম্পর্কটা আর প্রদর্শনের বিষয় ছিল না—এটা ছিল বাঁচার বিষয়।
দিনগুলো এগোতে লাগল। কখনো একসাথে, কখনো আলাদা ছন্দে। অনির্বাণ আগের মতো কাজের আড়ালে লুকোচ্ছে না, আবার মেঘলাও আর কাউকে কেন্দ্র করে নিজের সময় থামিয়ে রাখছে না। তারা দুজনেই বুঝে গেছে—ভালোবাসা মানে সারাক্ষণ পাশাপাশি থাকা নয়, বরং প্রয়োজনের সময় পাশে পাওয়া।
একদিন খুব সাধারণ একটা বিকেলে তারা দেখা করল। কোনো উপলক্ষ নেই। শহরের ভিড়ের বাইরে, একটা শান্ত বেঞ্চে বসে। সূর্য তখন ঢলে পড়ছে।
অনির্বাণ বলল,
— “আমরা কি ঠিক করছি?”
মেঘলা তাকাল আকাশের দিকে।
— “ঠিক–ভুলের হিসেব আমি আর করি না,” সে বলল। “আমি শুধু দেখি—আমি নিজেকে চিনতে পারছি কি না।”
অনির্বাণ মাথা নেড়ে বলল,
— “আমি পারছি।”
এই ছোট্ট কথোপকথনেই ছিল সব উত্তর।
কিছুদিন পরে তারা বুঝল—তারা আর একে অপরের প্রয়োজন নয়, তারা একে অপরের পছন্দ। এই জায়গাটা আলাদা। এখানে ভয় কম, সম্মান বেশি।
ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা বড় বড় কথা বলেনি। কেউ কাউকে ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। কিন্তু কেউ পালানোর পথও খোলা রাখেনি।
এক সন্ধ্যায় বিদায়ের সময় মেঘলা বলেছিল,
— “যদি কোনোদিন আলাদা হয়ে যাই—তাহলে কষ্ট হবে, কিন্তু আফসোস হবে না।”
অনির্বাণ শান্তভাবে বলেছিল,
— “কারণ আমরা মিথ্যে থাকিনি।”
এই সত্যটাই তাদের সম্পর্কের শেষ কথা।
গল্প এখানে থামে।
কিন্তু জীবনের মতো করে—নাটকীয় পর্দা নামিয়ে নয়, ধীরে আলো নিভিয়ে।
কারণ সব প্রেমের শেষ হয় না একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
কিছু প্রেম শেষ হয় এই বোঝাপড়ায়—
নিজেকে হারিয়ে নয়,
নিজেকে ঠিক রেখে—
তুমিই সেই।









ফ্ল্যাশব্যাক
 *******
কলেজের সেই বিকেলগুলো খুব সাধারণ ছিল।
এতটাই সাধারণ যে তখন কেউ বুঝতেই পারেনি—এগুলো একদিন স্মৃতি হয়ে উঠবে।
লাইব্রেরির পেছনের করিডরে বসে ইরা নোট লিখত, আর অনির্বাণ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত। পড়া হচ্ছিল না—কিন্তু একসাথে থাকা হচ্ছিল।
ইরা হঠাৎ বলেছিল,
— “You’re thinking too much again.”
অনির্বাণ হেসে বলেছিল,
— “I always do.”
এই কথোপকথনে কোনো প্রেমের উত্তেজনা ছিল না। ছিল একধরনের স্বস্তি। ইরা অনির্বাণকে ঠিক করার চেষ্টা করত না। সে শুধু পাশে থাকত—যেন বলছে, you don’t have to explain yourself here।
একদিন বৃষ্টি নেমেছিল হঠাৎ। দুজন একই ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। খুব কাছাকাছি, কিন্তু কোথাও স্পর্শ নেই।
ইরা হালকা গলায় বলেছিল,
— “You know, you’re not broken. You just pause a lot.”
অনির্বাণ সেদিন প্রথমবার ভেবেছিল—কারো কাছে নিজেকে প্রমাণ না করেও থাকা যায়।
কিন্তু ঠিক এখানেই ছিল সমস্যাটা।
ইরার সঙ্গে থাকলে অনির্বাণ ভবিষ্যৎ ভাবত না। কোনো ভয় ছিল না, কোনো দায়িত্বও না। Everything felt easy. Too easy.
একদিন ইরা জিজ্ঞেস করেছিল,
— “Do you ever think about… more?”
অনির্বাণ একটু থেমে বলেছিল,
— “I don’t know.”
ইরা আর প্রশ্ন করেনি। সে জানত—এই “I don’t know”-এর ভেতরেই সব উত্তর লুকোনো।
সময় গড়িয়েছে। তারা আলাদা পথে হেঁটেছে। কিন্তু ইরা থেকে গেছে অনির্বাণের জীবনে—একটা safe memory হিসেবে।
যেখানে গেলে নিজেকে শক্ত হতে হয় না,
কিন্তু বড়ও হতে হয় না।
আর ঠিক এই কারণেই,
মেঘলা আসার পর ইরার উপস্থিতি প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল।
কারণ
ইরা ছিল past comfort,
আর মেঘলা ছিল future responsibility.

সমাপ্তি... 🍁