Learning from humiliation. in Bengali Children Stories by SOHAN GHOSH books and stories PDF | অপমান থেকে শিক্ষা।

Featured Books
Categories
Share

অপমান থেকে শিক্ষা।

অপমান থেকে শিক্ষা।
লেখক:- সোহন ঘোষ।
Date:- 7 May 2025.

শ্যামাকান্ত, অনিল আর রজনী—সবসময় তিনজন একসঙ্গে থাকে। রজনী,শ্যামাকান্ত ও অনিলের থেকে কয়েক বছরের বড় হলেও, ওদের বন্ধুত্ব ছিল অটুট। প্রতিদিনের মতোই আজও তারা পার্কের বেঞ্চে বসে সময় কাটাচ্ছে।

শ্যামাকান্ত ও রজনী গল্পে মেতে থাকলেও, অনিল একেবারে চুপচাপ। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে চিন্তার ছাপ।

শ্যামাকান্ত লক্ষ্য করল ব্যাপারটা। সে জিজ্ঞেস করল, —“কি হয়েছে ভাই অনিল?” অনিল মুখ ফিরিয়ে বলল, —“কিছু না।”

রজনী ততক্ষণে অনুভব করেছিলেন কিছু একটা হয়েছে অনিলের। রজনী বলল, —“কিছু হয়নি বললেই কি হবে? আমরা তো তোকে চিনি। তুই কষ্ট পাচ্ছিস, সেটা বুঝতে পারছি।”

শ্যামাকান্তও যোগ দিল, —“তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিস। বল তো, কী হয়েছে?”

দুজনের এমন আন্তরিক কথায় অনিল আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল।

দু’জন বন্ধু তাকে কাছে টেনে বলল, —“বল আমাদের, আমরা তোর প্রকৃত বন্ধু। তোকে বোঝার চেষ্টা করব। এবং চেষ্টা করব যাতে তোর কষ্ট দূর হয়।”

অনিল ধীরে ধীরে বলল, —“আমি কি ভুল করে সায়েন্স নিয়েছি দাদা?”

—“কি বলছিস এসব?”—আশ্চর্য হয়ে বলল শ্যামাকান্ত।

অনিল বলল, —“আজ আমার প্রতিবেশী বন্ধু মধুসূদনকে ‘ভাই’ বলে ডেকেছিলাম। কিন্তু সে অপমান করল। বলল, আমি ওর থেকে গরিব, তাই সায়েন্স নেওয়ার যোগ্য নই। আরও অনেক কথা শুনতে হয়েছে।”

শ্যামাকান্ত মাথা নেড়ে বলল, —“আজকাল মানুষ সামান্য সাফল্য পেলেই অহংকারী হয়ে ওঠে।”

তখন অনিল‌ শ্যামাকান্তের দিকে তাকিয়ে বলল, —“কেন বন্ধু, গরিবরা কি সায়েন্স নিতে পারে না?”

শ্যামলাকান্ত বলল, ‘‘তোর সঙ্গে এটা খুব খারাপ হয়েছে।’’

অনিল মুখ নিচু করে বলল, “শুধু সে-ই নয় রে বন্ধু, আশেপাশের অনেকে—যেন কাঁটার বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে আমাকে। বলছে, দারিদ্র্যের পোশাক গায়ে চাপলে নাকি বিজ্ঞান নামক রাজপথে হাঁটার অধিকার থাকে না।”

রজনী বললেন, —“ভেঙে পড়ো না। এই অভিজ্ঞতাগুলোই আমাদের গড়ে তোলে।”

অনিল অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, —“মানে?”

রজনী এবার নিজের জীবনের একটি অধ্যায় খুলে ধরলেন, —“আমি যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, তখনও ইংরেজি ভালো করে জানতাম না। এর দোষ আমি কারো উপর চাপাতে চাই না।‌ তখন আমাদের প্রচণ্ড অভাব ছিল। বাবা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। ক্লাস ৫ থেকে ৮ পর্যন্ত কোনো মাস্টার পাইনি। ক্লাস নাইনে একটিমাত্র শিক্ষক পেলাম—তার কাছেই সব পড়তাম, ইংরেজি বাদে। ইংরেজি নিজে নিজেই শিখেছি। দশম শ্রেণীতে ওই একই ব্যাপার।

তবে মাধ্যমিকে ভালোভাবে পাশ করলাম। এরপর যখন সায়েন্স নিই, আমার এক বন্ধু সঞ্জয় বলে বসল—‘তুই তো ইংরেজি বলতেই পারিস না, তুই আবার সায়েন্স নিয়েছিস!’ সেদিন খুব কেঁদেছিলাম। আরেকদিন এক ছোট ছেলে, রঞ্জিত, বলল—‘‌ তুই তো ইংরেজি জানিস না, আমার সঙ্গে মজা করছিস?’ তখন মনে হয়েছিল মাটির নিচে ঢুকে যাই। প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল।

কিন্তু সেই অপমান আমায় ভেঙে দেয়নি। বরং শপথ করেছিলাম—যা-ই হোক, ইংরেজি শিখব। ফোনে শেখা শুরু করলাম। আজ মোটামুটি বলতে পারি। এখন আর রাগ হয় না, বরং মনে হয়, তারা এসব না বললে হয়তো আমি শেখার উৎসাহই পেতাম না।”

শ্যামাকান্ত বলল, —“তুমি তো এখন দারুণ ইংরেজি বলো”

রজনী হেসে বলল, —“না রে, এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে।”

অনিল একটু চুপ থেকে বলল, —“তোমার কথা শুনে সত্যিই অনেক কিছু শিখলাম। জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল যেন।”

রজনী অনিলের কাঁধে হাত রেখে বললেন, —“জীবনে অনেক বড় হতে পারো, কিন্তু এই কথাটা মনে রেখো—যখনই অহংকার করতে ইচ্ছে হবে, তখন এই অপমানগুলোর কথা মনে করো। ওগুলোই তোমায় বিনয়ী রাখবে। কারণ মানুষের জীবনে যখন সুখ আসে, তখনই সে দুঃখের দিনগুলো ভুলে যায়। এবং অহংকারী হয়ে ওঠে। মানুষকে মানুষ বলে মনে করে না। আর এটাই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠে। তখন তারা মানুষকে বিচার করে তার পেশা, অর্থ, জীবিকার দিক থেকে।”

অনিল মাথা নিচু করে বলল, —“দাদা, আমি মনে রাখব। চেষ্টা করব যেন জীবনে যতই সাফল্য আসুক, অহংকারী না হই। সমস্ত স্তরের মানুষকে সম্মান করতে শিখব।”

শ্যামাকান্ত একটু ভেবে বলল, —“আমিও বুঝতে পারছি, আজ কিছু মানুষের জন্যই সবাই ভাবে—সাফল্য মানেই অহংকার। অথচ সেটা ঠিক নয়। একটা ব্যতিক্রম তো পুরো শ্রেণিকে বিচার করতে পারে না। যেমন পর্যায় সারণিতে কিছু মৌলের ইলেকট্রন বিন্যাস ব্যতিক্রমী। আবার আমাদের হাতের পাঁচটি আঙুলও সমান নয়—কোনটা ছোট, কোনটা বড়। তবু সবকটাই দরকারি।”

“আসলে অনিল, আমরা ভাবি, সফল মানেই যেন অন্যকে ছোট করার লাইসেন্স। অথচ— ‘আকাশ যত উঁচু, ততই সে মাটির প্রতি নম্র। আর পর্বত যত দৃঢ়, ততই সে নিরব।’ আমরা তো ভুলেই গেছি এই সত্য।”