Srikanth's slander - Part 1 in Bengali Short Stories by SOHAN GHOSH books and stories PDF | শ্রীকান্তের অপবাদ - পর্ব 1

Featured Books
  • RAAKH - खामोश चीखों का शहर

    इस शहर में, सूरज उम्मीद जगाने नहीं उगता था; वह तो बस पिछली र...

  • Flower

    यह उस वक्त की बात है जब मैं 15 साल का था। मेरे लिए प्यार शब्...

  • औद्योगिक कचरा

    औद्योगिक कचरा और विकास  विवेक रंजन श्रीवास्तव आज आधुनिक विका...

  • अदृश्य पीया - 15

    (कमरा वही है… पर अब खाली नहीं—बल्कि दिखाई न देने से भरा हुआ।...

  • तेरे मेरे दरमियान - 76

    जानवी ने अपना चेहरा अपने हाथों में छुपा लिया।कार मे वो अकेली...

Categories
Share

শ্রীকান্তের অপবাদ - পর্ব 1

শ্রীকান্তের অপবাদ (পর্ব: ১)।  

লেখক:– সোহন ঘোষ।    

লেখকের নোট:“শ্রীকান্তের অপবাদ” একটি সামাজিক ছোটগল্প, যা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে।গল্পটির বিষয়বস্তু এখানে আলাদা করে উল্লেখ করলাম না। আমার বিশ্বাস, লেখকের ব্যাখ্যার চেয়ে পাঠকের নিজস্ব পাঠ-অভিজ্ঞতাই বেশি মূল্যবান। গল্পটি মন দিয়ে পড়লে তার অন্তর্নিহিত ভাব ও বক্তব্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরা দেবে।

──────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────────

                           


সে বছর আমরা ক্লাস সেভেন পেরিয়ে ক্লাস এইটে উঠেছি। বয়স তখন ঠিক সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে—যেখানে শৈশবের শেষ আলোটা তখনও ম্লান হয়নি, অথচ কৈশোর ইতিমধ্যে এসে কাঁধে হাত রেখেছে।


নতুন ক্লাসরুম, নতুন বেঞ্চ, নতুন বইয়ের গন্ধে ভরা প্রথম দিনের ভিড়েই চোখে পড়েছিল এক অপরিচিত মুখ। পরে আলাপ হতে জানলাম, ছেলেটির নাম শ্রীকান্ত বিশ্বাস।


বাবা মারা যাওয়ার পর শ্রীকান্ত ছিল অনেকটা বেড়াহীন চারাগাছের মতো। তাই শ্রীকান্তের মাতামহের আদেশে তার মামা তাকে মা ও ভাইয়ের কাছ থেকে একপ্রকার শিকড় ছিঁড়েই নিয়ে এলেন নিজের বাড়িতে। উদ্দেশ্য একটাই—যেন এই চারা গাছটা রোদ, জল আর বৃষ্টি পেয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে বাঁচতে পারে।


শুরুতে শ্রীকান্ত ছিল আমাদের কাছে নিছক এক ধুলোমাখা পাথর। কে জানত, এই সাধারণ আবরণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অমসৃণ হীরা! বাইরে থেকে আলোর ঝিলিক দেখা যেত না ঠিকই, কিন্তু অন্তরে যে জহরত লুকানো ছিল, তার পরিচয় পেতে বেশিদিন সময় লাগেনি।


সেবার সরস্বতী পুজোর সকালে হারমোনিয়ামের মৃদু সুর ছাপিয়ে যখন শ্রীকান্তর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, তখন পুরো স্কুল যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল। এই লাজুক ছেলেটির বুকের গহিনে যে এক অবাধ্য পাহাড়ি নদী বইছে, তা আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তার শান্ত স্বভাব আর মিতবাক চলাফেরা দেখে ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় ছিল না যে, তার ভেতরে সংগীতের এমন এক প্রাণবন্ত ঝর্ণাধারা সুপ্ত ছিল। 


পুজোর পর স্কুল খোলার প্রথম দিনেই মিতালী ম্যাম ক্লাসে এলেন। প্রতি বছরের মতো এবারও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীদের ভালো-মন্দ দিক নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন। 


এতদিন আমাদের ক্লাসে গান মানেই ছিল ঝিলিক রায়—প্রশংসার আলোটাও যেন ওকেই ঘিরে থাকত। কিন্তু এ বছর ছবিটা একটু বদলেছে। ঝিলিকের পাশাপাশি শ্রীকান্তও গান গেয়েছে, আর ম্যামের কথায় বোঝা গেল—শ্রীকান্তের কন্ঠ সবার মনেই প্রায় দাগ কেটেছে।


ম্যাম কেবল শ্রীকান্ত বা ঝিলিকের গান নিয়েই নয়, আমাদের করা নাটকের অভিনয় সম্পর্কেও বিস্তারিত বললেন। কোথায় আমরা ভালো করেছি আর কোথায় আরও উন্নতির সুযোগ আছে—সবটাই ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। এমনকি যারা নাচে অংশ নিয়েছিল, তাদেরও আলাদা করে প্রশংসা করতে ভোলেননি। 


প্রতি বছরই ম্যামের এই গঠনমূলক আলোচনা আমাদের পরের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিকে আরও দৃঢ় করে তুলত। শুধু আমাদের ক্লাসেই নয়, অন্য সব ক্লাসেও তিনি একইভাবে ছাত্রছাত্রীদের কাজ নিয়ে আলোচনা করতেন।


আগের বছরগুলোতে আমাদের চেয়ে এক বছরের বড় পাপিয়াদির গানের কথা ম্যাম প্রায় প্রতিটা ক্লাসে গিয়ে বলতেন এবং তার ভালোদিক বিচার করে প্রশংসা করতেন কিন্তু এবছর শ্রীকান্তের গানের গলা ম্যামকে এতটাই মুগ্ধ করেছে যে, প্রতিটা ক্লাসে গিয়ে শ্রীকান্তকে নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এমনকি পাপিয়াদিও আমাদের সামনে শ্রীকান্তের বেশ প্রশংসা করেছিলেন।


তবে এই গান গাওয়া ছাড়াও শ্রীকান্ত লোকেদের খুব সাহায্য করতো। শ্রীকান্তের সামনে কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য চাইবার আগেই সে এগিয়ে যেত। কথায় আছে, যে যাচিয়া বিলায় তাহার নাকি কদর থাকে না। শ্রীকান্তের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের খুব একটা ব্যতিক্রম হয়নি। তবে আমাদের কয়েকজনের কাছে তার মূল্য কিন্তু আর পাঁচজনের অবহেলায় কমতো না।

 মাঝে মাঝে আমরাও যে তাকে অবজ্ঞা করিনি—তা বললে বোধহয় একটু ভুলই বলা হবে।"


তার ব্যাগটা দেখলে প্রথমে হাসি পেত। বইখাতার পাশে একটা বাক্সের মধ্যে যত্ন করে রাখা থাকত ব্যান্ডেজ, তুলো, মলম, কাঁচি, সূচ, সুতো, বেশ কিছু বোতাম, স্ক্রু-ড্রাইভার ইত্যাদি—সব জিনিসপত্র যত্ন সহকারে রেখে দিত। কোথা থেকে সে এ-সব সংগ্রহ করেছিল, তা জানি না। তবে এগুলো দিয়ে পারত না—এমন কোনো কাজ নেই।


একবার আমাদের ক্লাসের পিন্টু বর্মনের ভাইয়ের হাওয়াই চটির ফিতে খুলে গেলে, তার ভাই যখন আমাদের ক্লাসে এসে তার দাদার কাছে দাঁড়িয়ে কান্না করতে থাকে, তখন শ্রীকান্তই কোথা থেকে একটা শক্ত কঞ্চি জোগাড় করে এনে নিজের ব্যাগ থেকে একটা দড়ি বের করে ফিতেটা লাগিয়ে দেয়। 


খেলতে গিয়ে কখনো হাত-পা কেটে গেলে আমরা আর অফিসে যেতাম না। কারণ অফিসে ব্যান্ডেজ-তুলোর সঙ্গে স্যারেদের বকুনিও জুটত। তার চেয়ে শ্রীকান্তর কাছে যাওয়াই ভালো ছিল—ওখানে ছিল নীরব যত্ন আর ভরসার একটা নিশ্চিন্ত জায়গা।


এসব সাহায্য ছাড়াও মজার প্রকৃতির এই ছেলেটি গল্প আর অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গিতে আমাদের ভরিয়ে রাখত। গোমড়ামুখো এই শহরে মন খারাপের দিনে, এই ছেলেটির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই বুকের ভেতরের ভার হালকা হয়ে যেত।


তবে আস্তে আস্তে আমাদের ক্লাসে কিছু পালোয়ান স্বভাবের ছেলেদের কাছে এই শ্রীকান্তই যেন তাদের বাহাদুরি দেখানোর প্রদর্শনীর স্থায়ী মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। কখনো সিনিয়র দাদাদের চোখের সামনে, কখনো ছোটদের ভিড়ে, আবার কখনো মেয়েদের সামনে—তারা শ্রীকান্তকে ঘুষি, চড়, ধাক্কা মেরে নিজেদের শক্তি জাহির করত। 


কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শ্রীকান্ত কোনোদিন পাল্টা হাত তুলত না, কোনো প্রতিবাদ করত না। চুপ করে সহ্য করত।


ধীরে ধীরে অনেকে তাকে বিদ্রূপ করে ‘শ্রী ক্যাবলাকান্ত বিশ্বাস’ বলে ডাকতে শুরু করল। 


একদিন বাথরুম থেকে ক্লাসে আসার সময় রানা শ্রীকান্তের বাহুতে একটা জোর ঘুষি মেরে হাত দুটোকে পালোয়ানের মতো ফাঁক করে হাসতে হাসতে হেঁটে চলে যায়। 


এই দৃশ্য দেখে সুদীপ শ্রীকান্তকে দাঁড় করিয়ে বলল,  

“আচ্ছা তুই ওকে কিছু বললি না কেন? একটা রোগা-পটকা ছেলে, যাকে ফুঁ দিলেই উড়ে যায়?”


শ্রীকান্ত একই শান্ত গলায় বলল,  

“আমার বাবা বলতেন, মারপিট করা মোটেও ভালো জিনিস না। এতে দু-পক্ষেরই ক্ষতি হয়।”


“তোর বাবা বলেছে—যতসব ফালতু কথা। আসলে তুই মারপিট করতে জানিস না। ওর থেকে তুই আমার চেলা হয়ে যা, আমি তোকে মারপিট করা শিখিয়ে দেব। গুরুদক্ষিণা হিসেবে বরং পা-টা একটু টিপে দিবি।”


শ্রীকান্ত কোনো উত্তর না দিয়ে চলে আসে। 


এইসব ঘটনার কথা রাজের মুখে শুনে আমি বলেছিলাম,  

“দেখ শ্রীকান্ত, তোকে কেউ কামড়াতে বলছে না রে, কিন্তু অন্তত একটু ফোঁস তো করবি! না হলে লোকে তো তোকে পেয়ে বসবে।”


তখন শ্রীকান্ত আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে বলল,  

“যদি আমাকে মেরে কেউ আনন্দ পায়, তাহলে পেতে দে না। আমরা তো সবাই বন্ধু। তা ছাড়া গ্রাম থেকে শহরে আসার সময় মা আমাকে কড়া করে বলে দিয়েছেন—শহরে যাচ্ছ পড়াশোনা করার উদ্দেশ্যে, ভালো করে পড়াশোনা করবে। কারো সঙ্গে ঝগড়া, অশান্তি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবে না। এখন আমি মায়ের কথা তো আর ভাঙতে পারি না।”


ওকে আমরা কত বুঝিয়েছি, কত বলেছি, কিন্তু কে শুনে কার কথা? ও সেই একই রকম। 


একবার সকালে স্কুলে ঢুকে দেখি, ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে শ্রীকান্তর নাম লিখে ব্যঙ্গাত্মক ছড়া—  


শ্রী ক্যাবলাকান্ত বিশ্বাস,  

    বুদ্ধিতে আস্ত হাঁস।  

মার খায় ধুসধাস,  

   করে নাকো ফুঁস-ফাঁস।  

গোবর ভরা মাথা,  

    শ্রীকান্ত একটা বোকা।


তবে সে কিন্তু এটা হাসিমুখেই এড়িয়ে গিয়েছিল। 


শুধু ছাত্ররা নয়, অনেক “কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকাও আড়াল-আবডালে শ্রীকান্তকে ‘ফিউজ ওড়া ব্রেন’ বা ‘তারকাঁটা’ বলে বিদ্রূপ করতেন। কিন্তু শ্রীকান্ত? সে যেন এক পদ্মপাতা—বিদ্রূপের

কোনো জলই তার গায়ে দাগ কাটতে পারত না। সে হাসিমুখে সবকিছু এড়িয়ে যেত।