Mayador - 9 in Bengali Love Stories by Rayhana Yasmin Ray books and stories PDF | মায়াডোর - পর্ব 9

Featured Books
  • दोस्ती

    आज संदलपुर में रौनक ही रौनक थी क्योंकि आज बहुत ही पहुंचे हुए...

  • प्रेम पल्लवी - 3

    आधा रास्ता लाज भरी खामोशी में तय हो चुका था। सन्नाटा इतना गह...

  • वो दूसरी मुलाकात

    "वो दूसरी मुलाकात"हिंदी कहानी (लगभग 2000 शब्द)  लेखक: विजय श...

  • बेड़ियां

    बेड़ियांरात के 2:37 बज रहे थे।पूरा शहर नींद में डूबा था, लेक...

  • चलो दूर कहीं..! - 15

    चलो दूर कहीं... 15सारा और प्रतीक्षा कैंटीन में बैठी रोहन का...

Categories
Share

মায়াডোর - পর্ব 9

রায়হানা ইয়াসমিন রায় 

কৃষ্ণসায়র পার্কের মায়াবী বিকেলটা কেটেছে মাত্র দু দিন আগে। কাল সন্ধ্যায় ওরা বাড়ি ফিরেছে। টানা পাঁচদিন পর নিজের চিরচেনা ঘরে ফিরে মেহুলের এক অদ্ভুদ শূন্যতা অনুভব করছে। পরশু ২১শে অক্টোবর মেহুলের বিশতম জন্মদিন। বাড়ির বড়োরা মেহুলকে সারপ্রাইস দেওয়ার জন্য মনে মকনে অনেক পরিকল্পনা করে রেখেছেন, যার বিন্দু মাত্র আভাস মেহুলের কাছে নেই। মেহুলের নিজেরও এসব নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই।
আজ শুক্রবার। অনেকদিন পর মেহুল কলেজ যাওয়ার জন্য তৈরী হলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিজাবটা ঠিক করে যখন সে নিচে নামছিল, ঠিক তখনি সিঁড়িতে আদ্রিয়ানের সাথে দেখা। আদ্রিয়ান ওপরের দিকে যাচ্ছিলো। মেহুলের খুব পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় সে মেহুলের দিকে একবারও তাকালো না। এক অদ্ভুদ নির্লিপ্ততা নিয়ে ওপরে চলে গেলো, যেন মেহুল সেখানে নেই–ই। মেহুল বুক চিরে আসা দীর্ঘশ্বাস চেপে নিচে নাস্তা করতে বসলো। নিচে নাস্তা করতে বসতেই আফতাব চৌধুরী আসল বোমাটা ফাটালেন। আফাতাব চৌধুরী চায়ে চুমুক দিয়ে নিচু কিন্তু গম্ভীর স্বরে বললেন— "শুনছো নিশি, আমাদের মেহুলের জন্য একটা চমৎকার সম্বন্ধ এসেছে।"
কথাটা শোনা মাত্রই মেহুলের গলায় খাবার আটকে গেলো। ও কোনোমতে খাবারটা গিললো। নিশিতা চৌধুরী রান্নাঘর থেকে কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন,, "কোথা থেকে এসেছে ?"
"আরে ওই যে আমার বন্ধু মুস্তাফ আছে না ? ওর একমাত্র ছেলে শিহাব। শিহাব এখন ক্যালিফোর্নিয়াতে খুব ভালো কাজ করছে। মুস্তাফ নিজেই আমার কাছে মেহুলের কথা পেড়েছে। ওরা বলেছে সামনের সপ্তাহে আসবে মেহুলকে দেখতে।"
নিশিতা চৌধুরীর কপালে ভাঁজ পরলো। তিনি শুকনো গলায় বললেন— "এখনই কেন? আগে মেয়েটার কলেজটা তো শেষ হোক।"
আফতাব চৌধুরী খাওয়া শেষ কিরে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন— "আরে ওর বিয়ে কি আমি এখনই দিয়ে দিচ্ছি? ওরা আসুক, ছেলে মেয়ে একে অপরকে দেখুক। কথাবার্তা বলে ঠিক করে রাখা হবে। বিয়ে না হয় ওর লেখাপড়া শেষ করেই দেওয়া হবে। ওরা তাহলে সামনের সপ্তাহে আসছে। সব ব্যবস্থা করো রেখো।"
মেহুলের মনে হলো চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন তাকে পিষে দিচ্ছে। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকতে পারলো না। কোনো মতে বাকি খাওয়াটা শেষ করেই কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো।
কিন্তু কলেজে গিয়ে মেহুল এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারলো না। লেকচার হলের আওয়াজগুলো তার কানে স্রেফ শোরগোল মনে হচ্ছিলো। 'বিয়ে', 'ক্যালিফোর্নিয়া', 'সম্বন্ধ', — এই শব্দ গুলো ওর মাথায় হাতুড়ির মতো পিটছে। শেষমেষ আর কোনো ক্লাস না করেই বাড়ির পথ ধরলো।
বাড়ির গেটের সামনে আসতেই দেখলো আদ্রিয়ান বেরোচ্ছে। আজ শুক্রবার বলে ওর কোনো ক্লাস নেই, এই একটা দিনই ও সময় পাই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার। আদ্রিয়ানকে দেখে মনে হচ্ছিলো ও খুব ফুরফুরে মেজাজে আছে।হাতে বাইকের ছবিটা বনবন করে ঘোরাতে ঘোরাতে ও শিস দিচ্ছে। মেহুলকে দেখে ও শুধু একবার এক ভ্রু উঁচিয়ে দেখলো। মুখে কোনো কথা নেই। তারপর মেহুলের খুব পাশ কাটিয়ে বাইকের দিকে চলে গেলো আদ্রিয়ান।
মেহুল অবাক হয়ে পেছন ফিরলো। মেহুল যখন পেছন ফিরলো দেখলো, আদ্রিয়ান বাইকের ওপর বসে আঙুলের ইশারায় ওকে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার হুকুম দিচ্ছে। মেহুলও মেজাজ দেখিয়ে মুখ বাকিয়ে ভেতরে চলে গেলো।
আদ্রিয়ান হেলমেট পরতে পড়তে মনে মনে হাসলো। একটা বাঁকা হাসি টার ঠোঁটের কোনে ঝিলিক দিয়ে উঠলো। সে বিড়বিড় করে বললো— 
"খুব জ্বালাচ্ছিস আমায় তুই সুইটহার্ট। সব বদলা কিন্তু আমি একেবারেই তুলবো।"
প্রচন্ড গতিতে বাইক স্টার্ট দিয়ে আদ্রিয়ান বেরিয়ে গেলো।
মেহুল নিজের ঘরে গিয়ে দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দিল। বিছানায় উপর হয়ে শুতেই চোখের বাঁধ ভেঙ্গে পানি গড়িয়ে পরল। ডুকরে কেঁদে উঠে সে নিজেকেই প্রশ্ন করলো— 
"কেন আমায় এই মায়ায় বাঁধছো তুমি?যখন আমাদের এক হওয়া অসম্ভব।"
 খানিকক্ষণ পর উঠে দাঁড়িয়ে ও আয়নার সামনে গিয়ে নিজের বিধ্বস্ত চেহারাটা দেখলো। চোখ চোখ মুছে শক্ত গলায় নিজেকেই শোনালো— 
"আর না! এই মায়া এখানেই শেষ করতে হবে।এবার থেকে তুমি তোমার রাস্তায়, আর আমি আমার রাস্তায়।"


নিউটনের সেই জনপ্রিয় ক্যাফে 'চায় ব্রেক'। রাজ আর সাকিব ওখানে অপেক্ষা করছে আদ্রিয়ানের জন্য। রাজ বহু বছর পর বিদেশ থেকে কালই ফিরেছে, তাই ওর সাথে আজ আদ্রিয়ান আর সাকিব দেখা করতে এসেছে। আদ্রিয়ান ক্যাফের ভেতরে ঢুকতেই সাকিব ফিক করে হেসে উঠলো,,
"ইশ আদি, তুই একা এলি ? মাইরা কে আনলি না সাথে ?"
কথাটা শোনা মাত্রই আদ্রিয়ানের চোয়াল শক্ত গেলো। ও সাকিবের শার্টের কলারটা শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো— 
"শালা, তোকে কতবার বললো ও তোর ভাবি হয়। নাম ধরে ডাকবি না একদম।"
রাজ ওদের লড়াই দেখে চেঁচিয়ে উঠলো,
"আরে থাম তোরা। তোরা করে এখানে আমাকে তোদের লড়াi দেখার জন্য ডেকেছিস? সাকিব, আদি তো ঠিকই বলেছে, তুই ওর হবু বউকে কেন নাম ধরে ডাকবি। এবার থেকে ভাবিই বলবি।"
আদ্রিয়ান ওর কলার ছেড়ে দিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পরলো। রাজ হেসে বললো— "কি খাবি তোরা বল ?"
সাকিব শার্ট ঠিক করতে করতে বললো— "হ্যাঁ কাবো তো, কারণ আজ বিল তো তুই দিবি। তোর পকেট ফাঁকা না করা পর্যন্ত আমি থামছি না।"
আদ্রিয়ান বেশিক্ষণ সেখানে বসলো না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে হটাৎ উঠে দাঁড়ালো।
"আমি এখন আসছি, জুমার সময় হয়ে আসছে। বিকেলে এখানে আসবি তোরা! ওকে বাই।
রাজ অবাক হয়ে বললো— " যাহ বাবা! ওর তাহলে আসার কি দরকার ছিল?"
সাকিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো— "তার থেকে বরং আমাদেরই বাড়িতে ডেকে নিতো, তাহলে মাইরার হাতের এক কাপ চা খেতাম।"
রাজ এবার খেঁখিয়ে উঠলো— "এই জন্য শালা তুই আদির হাতে মার খাস! চল এবার জুমার সময় হয়ে আসছে, দের হয়ে যাবে।"

বাড়ি ফেরার পথে আদ্রিয়ানের চোখ গেলো ফুটপাতের ধারে নার্সারিটাতে। বাইক থেকে নেমে ও একটা তরতাজা কাঠগোলাপের চারা কিনলো। সে জানে মেহুলের এই ফুলটা বড্ডো প্রিয়।
বাড়ি পৌঁছে ও সোজা পেছনের বাগানে চলে গেলো। মেহুলের রুমের ব্যালকনির সোজা নিচে খুব যত্ন করে গাছটা রোপন করতে শুরু করলো। মেহুল যখন মন খারাপ কোনো ব্যালকোনিতে এসে দাঁড়াবে, তখন এই গাছ দেখে ওর মন ভালো হয়ে যাবে।
গাছ লাগানো শেষ করে আদ্রিয়ান যখন হাত ঝাড়তে ঝাড়তে ওপরে তাকালো, দেখলো মেহুল ব্যালকোনিতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওর ম্লান মুখ আর উদাস দৃষ্টি দেখে আদ্রিয়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ। ও মনে মনে ভাবলো— "এর আবার কি হলো? এমন ভাবে তাকিয়ে আছে কেন? যাই হোক ব্যাপার টা এসে দেখছি, আগে জুমাটা পরে আসি।

মধ্যদুপুরের তপ্ত রোদ চারিদিকের নিস্তব্ধতাকে যেন এক অদ্ভুত বিষন্নতায় মুড়ে দিচ্ছে। আজ দুপুরে খাবার টেবিলে মেহুল খেতে নামেনি। নিশিতা চৌধুরী অনেক ডেকেছেন, দরজায় করা নেড়েছেন, কিন্তু মেহুল দরজা খোলেনি। ভেতর থেকে কেবল একটা ক্ষীণ স্বর ভেসে এসেছে— "পরে খেয়ে নেবো ফুফু।" আদ্রিয়ান ভেবেছিলো মেহুলের হয়তো সত্যিই শরীর খারাপ, তাই সে আর ডাকতে যায়নি। তবে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, রাতের অবসরে ওর সাথে কথা বলবে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার অপেক্ষায়। বাড়ির বড়োরা যে ঘরে বিশ্রামে মগ্ন। কিন্তু ছোট্ট আরাধ্যা এ যেন এক চলন্ত তুফান। ওর চোখে ঘুম নেই। ওপরে গিয়ে মেহুলের দরজায় হানা দিলো সে। মেহুল দরজায় খিল দিয়েও রেখেছিলো, কিন্তু আরাধ্যা তো নাছোড়বান্দা। অনেকবার ডাকার পর শেষমেষ মেহুলকে দরজা খুলেতেই হলো, কারণ আরাধ্যার জেদের কাছে বাড়ির সবাই হার মানে। মেহুল দরজা খুলে আবার বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পরলো।
আরাধ্যা রুমে ঢুকেই ওর চিরচেনা বাইনের ঝুলি খুলে বসলো— "ইরা দিদি, চলো না খেলি!" 
মেহুলের বুঁকের ভেতরে তখন এক প্রলয়ংকরী ভাঙাগড়ার লড়াই চলছে, বাইরের খেলার শক্তি ওর নিঃশেষিত। আজ যে মেহুলের মন মেজাজ কিছুই ভালো নেই। সে কোনো মতেই খেলতে রাজি হলো না। আরাধ্যা জোর করে মেহুলকে টেনে তুলতেই থমকে গেলো। মেহুলের টানা টানা চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে, নাক টা ভুলে উঠেছে কান্নায়।

আরাধ্যা চোখ ছোট ছোট করে অবাক গলায় শুধলো— 
"ইরা দিদি, তুমি কাঁদছিলে কেন ?"
মেহুল ভিজে আসা স্বর লুকিয়ে, নাক টেনে কোনো মতে 
বললো— "কোই না তো!"
আরাধ্যা এবার হাত দিয়ে মেহুলের গাল ছুঁয়ে বললো—
"মিথ্যা বলো না, আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি কেঁদেছো বলেই তোমার চোখ মুখ এমন লাল হয়ে গেছে। আমাকেও যখন মা বকা দেই আমিও কাঁদি, আমারও চোখ তখন এমন লাল হয়ে যাই।"
একটু থেমে আবার কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো—
"তোমাকে কি মা বকেছে?"
মেহুল নিরুত্তর। মেহুল ওর কোমর অবধি লম্বা চুলটাকে হাত খোপা করে নিতে নিতে বললো— "তুই যা এখন, আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না।"
কিন্তু আরাধ্যা তো দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে যতক্ষন না জানবে মেহুল কেন কেঁদেছে, সে যাবেই না। ও একটু জেদি স্বরে বললো— "নাহ, আমি যাবো না। আগে বলো তুমি কেন কেঁদেছিলে, তারপর যাবো।"
মেহুল এবার ধৈর্য হারিয়ে কিছুটা ধমকের সুরে বললো— "আরাধ্যা,, বড্ডো বেশি বেশি কথা বলছিস। তোকে যেতে বললাম না। যা এখন।"
আরাধ্যা অভিমানে ঠোঁট বাকিয়ে বললো— "আমাকে বকলে তো ইরা দিদি? আমি আর আসবো না তোমার কাছে।"
বলেই ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। মেহুল পেছন থেকে করুন সুরে ডাকলো— "আরাধ্যা শোন্, আমি তোকে বকতে চাইনি....!"
কিন্তু কে শোনে কার কথা! আরাধ্যা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তখন মুখ টিপে হাসছে। সে কোমরে হাত দিয়ে ভাবছে— আমাকে তো জানতেই হবে ইরা দিদি কেন কাঁদছিলো!"

পরক্ষনেই সে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে হাজির হলো আদ্রিয়ানের ঘরের দরজায়, এসেই ডাকাডাকি শুরু করলো— " ভাইয়া দরজা খোলো, আমি এসেছি, দরজা খোলো।"
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সারা নেই। এবার আরাধ্যা ওর গলার সবটুকু তেজ নিয়ে শেষবারের মতো চেঁচাল—
"ভাইয়াআআআআ........ দরজা খোলো......."
বিরক্তি নিয়ে আদ্রিয়ান দরজা খুললো। ওর গলায় তখন হেডফোন ঝুলছে, সম্ভবত ও অডিওবুক শুনছিলো, তাই আরাধ্যার ডাক ওর কানে যাই নি। আদ্রিয়ান গম্ভীর স্বরে বললো— " কি হয়েছে, এই ভরদুপুরে চেঁচামেচি করছিস কেন এইভাবে..!"
 আরাধ্যা হাঁপাতে হাঁপাতে একনাগাড়ে বলে চললো—
"আরে ইরা দিদি না কাঁদছে। কেঁদে কেঁদে একদম চোখ–মুখ লাল করে ফেলেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেন কেঁদেছে, উল্টে আমাকেই বকা দিয়ে দিলো। তাই আমি তোমাকে ডাকতে এসেছি!"
আদ্রিয়ানের প্রসন্ন কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ পরলো। ওকে নিশ্চল দারিয়ে থাকতে দেখে, আরাধ্যা ওর হাত ধরে টানতে লাগলো— " ভাইয়া তুমি চলো...!"
আদ্রিয়ান বিরক্তি প্রকাশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো— "আচ্ছা যাচ্ছি চল।"
আদ্রিয়ান যখন মেহুলের ঘরে প্রবেশ করলো, মেহুল তখনও বিছানায় উপুড় হয়ে নিজের বিষাদ নিয়ে পরে আছে। আদ্রিয়ান ধীর পায়ে আগলে দাঁড়ালো বিছানার পাশে। ওর সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ঘরের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো— " মাইরা!"

ডাকটা মেহুলের কানে পৌঁছাতেই ও বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো ধরফড়িয়ে উঠে বসলো। ও দেখলো আরাধ্যা আদ্রিয়ানের আধো লুকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। মেহুল আরাধ্যার দিকে তাকাতেই বুঝলো কাজটা এই পুঁচকেই করেছে।

আদ্রিয়ান এবার কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম করে শুধলো— 
"কাঁদছিলি কেন তুই?"
মেহুল আমতা আমতা করে বললো— "কোই,, কোই না তো।"
আদ্রয়মের কণ্ঠস্বর এবার কঠিন হলো— "আমাকে বকা বানাচ্ছিস?" আমি কি তোকে চোখে দেখতে পাই না,? কেঁদে কেঁদে চোখে মুখের কি হাল করেছিস এটা?"
আদ্রিয়ান এবার আস্তে করে বিছানার উপর বসলো। শীতল গলায় জিজ্ঞাসা করলো— "কেন কেঁদেছিলি? কেউ কিছু বলেছে তোকে?"
মেহুল কেবল ডানে–বামে মাথা নাড়ালো। আদ্রিয়ান আবারও প্রশ্ন করলো— "তাহলে কাঁদছিস কেন?"
মেহুল কিছু বলার আগেই পাশ থেকে আরাধ্যা বলে 
উঠলো— "আমি জানি ভাইয়া, ইরা দিদি কেন কাঁদছিলো!"
আদ্রিয়ান আরাধ্যার দিকে ফিরে ছোট্ট করে বললো— "কেন?"
আরাধ্যা উত্তর দিলো— "আব্বু ইরা দিদির বিয়ে দিয়ে দেবে বলেছে, তাই জন্যই হয়তো ইরা দিদি কাঁদছে।"
অআদ্রিয়ানের সারা শরীর যেন মুহূর্তের জন্য জমে গেলো। ও স্থির দৃষ্টিতে আরাধ্যার দিয়েক তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো—
"তোকে কে বললো ওর বিয়ে দিয়ে দেবে?"
আরাধ্যা ফিসফিস করে বললো— "আমি তো লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছি। আব্বু সকালে খাবার টেবিলে মা কে বলছিলো।"
আদ্রিয়ান এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরাধ্যা কে বললো—
"ঠিক আছে, তুই এবার যা। এই এই কথা যেন ভুলেও কারোর কানে না যাই। যা এবার।"
আরাধ্যা আদ্রিয়ানের আদেশের কাছে নতমস্তক, ও আদ্রিয়ানের অবাদ্ধ হতে পারে না। আরাধ্যা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে, চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
আরাধ্যা যেতেই আদ্রিয়ান নিঃশব্দে উঠে গিয়ে দরজায় খিল দিয়ে দিলো। মেহুলের বুঁকের ভেতরটা তখন তীব্র এক অজানা আশঙ্কায়ধক করে উঠলো।আদ্রিয়ান ধীর পদক্ষেপে মেহুলের মুখোমুখি এসে বসলো।

"কি বলেছে আব্বু? যদি আমার থেকে কিছু লুকানোর চেষ্টা করেছিস, তাহলে জানে মেরে ফেলবো।" আদ্রিয়ানের গলার স্বর যদিও শীতল কিন্তু তাতে ছুরির ফলার মতো ধার।
মেহুল এবার থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটে সকালে আফতাব চৌধুরীর বলা প্রতিটি কথা— সেই সম্বন্ধ, ক্যালিফোর্নিয়া,আর সেই অচেনা যুবকের কথা— সবটুকু এক নিঃশ্বাসে বলে দিলো। মুহূর্তেই আদ্রিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ওর অবয়ে এক কঠিন গম্ভীর্য ফুটে উঠলেও ওর ভেতরে তখন এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মেহুলকে হারানোর এক অমোঘ ভয় ওর শিরায় শিরায় ঝড় তুলে দিচ্ছে। তবুও নিজেকে সংযত করে সে মেহুলের দিকে তাকিয়ে খুব ধীর, কিন্তু নরম গলায় 
বললো— "এই সব নিয়ে ভাবার আর দরকার নেই। যা দেখার আমি দেখে নেবো বুঝেছিস।"
 কথাটা বলেই আদ্রিয়ান উঠে দাঁড়াল, দরজার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু চৌকাঠ পেরোবার আগে হটাৎ করেই সে আবারও ফিরে এল। এবার মেহুলের ওপর অনেকটা ঝুঁকে পড়ে ওর কানের কাছে তপ্ত নিশ্বাসে ফিসফিস করে বলল— 
"আর শোন, আজ থেকে যদি আমি তোকে একবারও কাঁদতে দেখি, কসম করে বলছি মাইরা— তোর এই চোখ সারাজীবন কাঁদতে থাকবে... আমার দেওয়া ব্যথায়।"

তীব্র এক শীতল স্রোত মেহুলের শিরদাড়া বয়ে গেলো। আদ্রিয়ান গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো, কিন্তু ওর হুমকির রেশ যেন ঘরের বাতাসে তখনও কাঁপন ধরাচ্ছিলো। মেহুল স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো, আদ্রিয়ানের মায়া আর শাসনের গোলোকধাঁধাই।