মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৬৭
অসিতদেবল, জৈগীষব্য ও সারস্বতের কাহিনি
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
অসিতদেবল, জৈগীষব্য ও সারস্বতের কাহিনি
বলরাম সরস্বতী নদীর তীরে সপ্তসারস্বত কপালমোচন প্রভৃতি বহু তীর্থ দর্শন করে আদিত্যতীর্থে উপস্থিত হলেন। প্রাচীনকালে তপস্বী অসিতদেবল গার্হস্থ্য ধর্ম পালন কোরে সেখানে বাস করতেন। তিনি সর্ববিষয়ে সমদর্শী ছিলেন, নিত্য দেবতা ব্রাহ্মণ ও অতিথির পূজা করতেন এবং সর্বদা ব্রহ্মচর্যে ও ধর্মকার্যে রত থাকতেন। একদিন ভিক্ষু জৈগীষব্য মুনি দেবলের আশ্রমে এলেন এবং যোগনিরত হয়ে সেখানেই বাস করতে লাগলেন। তিনি কেবল ভোজনকালে দেবলের নিকট উপস্থিত হতেন। দীর্ঘকাল পরে একদিন দেবল জৈগীষব্যকে দেখতে পেলেন না। দেবল ভাবলেন, আমি বহু বৎসর এই অলস ভিক্ষুর সেবা করেছি, কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে কোনও কথা বলেননি। আকাশচারী দেবল একটি কলস নিয়ে মহাসমুদ্রে গেলেন এবং দেখলেন, জৈগীষব্য পূর্বেই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। দেবল বিস্মিত হলেন এবং স্নানাদির পর জলপূর্ণ কলস নিয়ে আশ্রমে ফিরে এসে দেখলেন, জৈগীষব্য নীরবে স্থির হয়ে বসে আছেন। মন্ত্রসিদ্ধ দেবল ভিক্ষু জৈগীষব্যের শক্তি পরীক্ষার জন্য আকাশে উঠলেন এবং দেখলেন অন্তরীক্ষচারী সিদ্ধগণ জৈগীষব্যের পূজা করছেন। তার পর তিনি দেখলেন, জৈগীষব্য স্বর্গলোক পিতৃলোক যমলোক চন্দ্রলোক প্রভৃতি স্থানে এবং বহুবিধ যজ্ঞকারীদের লোকে গেলেন এবং অবশেষে অন্তর্হিত হলেন। দেবল জিজ্ঞাসা করলে সিদ্ধ পুরুষগণ বললেন, জৈগীষব্য শাশ্বত ব্রহ্মলোকে গেছেন, সেখানে তোমার যাবার শক্তি নেই। দেবল বিনয়ে অবনত হয়ে জৈগীষব্যকে বললেন, আমি মোক্ষধর্ম শিখতে চাই। জৈগীষব্য যোগের বিধি এবং শাস্ত্রানুযায়ী কার্যের সম্পর্কে উপদেশ দিলেন। দেবল সন্ন্যাসগ্রহণের সংকল্প করলেন, তখন আশ্রমের সমস্ত প্রাণী, পিতৃগণ এবং ফলমূল লতা প্রভৃতি বলতে লাগল, ক্ষুদ্র দুর্মতি দেবল সর্বভূতকে অভয় দিয়েছিল তা ভুলে গেছে, সে নিশ্চয় আমাদের বিনাশ করবে। দেবল ভাবতে লাগলেন, মোক্ষধর্ম আর গার্হস্থ্যধর্মের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ। অবশেষে তিনি মোক্ষধর্মই গ্রহণ কোরে সিদ্ধিলাভ করলেন।
বৃহস্পতিকে সামনে নিয়ে দেবগণ ও তপস্বিগণ উপস্থিত হলেন এবং জৈগীষব্য ও দেবলের তপস্যার প্রশংসা করলেন। কিন্তু নারদ বললেন, জৈগীষব্যের তপস্যা বৃথা, কারণ তিনি তার শক্তি দেখিয়ে দেবলকে বিস্মিত করেছেন। দেবতারা বললেন, দেবর্ষি, এমন কথা বলবেন না, মহাত্মা জৈগীষব্যের তুল্য প্রভাব তপস্যা ও যোগসিদ্ধি আর কারও নেই।
তারপর বলরাম সোমতীর্থ দর্শন কোরে সারস্বত মুনির তীর্থে গেলেন। প্রাচীনকালে সরস্বতী নদীর তীরে তপস্যারত দধীচি মুনি অলম্বু অপ্সরাকে দেখে বিচলিত হয়ে সরস্বতী নদীকে সম্ভোগ করেন, তার ফলে সরস্বতী নদীর গর্ভে তার একটি পুত্রের জন্ম হয়। প্রসবের পর সরস্বতী দধীচিকে সেই পুত্র দান করলেন। দধীচি তুষ্ট হয়ে সরস্বতীকে বর দিলেন, তোমার জলে তর্পণ করলে দেবগণ পিতৃগণ গন্ধর্বগণ তৃপ্ত হবেন এবং সমস্ত পুণ্যনদীর মধ্যে তুমি পুণ্যতমা হবে। দধীচি তার পুত্রের নাম রাখলেন সারস্বত। এই সময়ে দেবদানবের বিরোধ চলছিল। দধীচি দেবগণের কল্যাণে প্রাণত্যাগ করে তাঁর অস্থি দান করলেন, তাতে বজ্র নামক দিব্যাস্ত্র নির্মিত হোলো এবং ইন্দ্র সেই বজ্রের আঘাতে বৃত্রাসুর ও দানবগণকে জয় করলেন।
কিছুদিন পরে একটানা বারো বছর ধরে ভয়ংকর অনাবৃষ্টি হোলো, মহর্ষিগণ ক্ষুধার্ত হয়ে প্রাণরক্ষার জন্য নানাদিকে যাত্রা করলেন। সারস্বত মুনিও যাবার ইচ্ছা করলেন, কিন্তু সরস্বতী তাকে বললেন, পুত্র, যেয়ো না, তোমার ভোজনের জন্য আমি সুস্বাদু মাছ দেবো। সারস্বত তার আশ্রমেই রইলেন এবং মাছ ভোজন কোরে প্রাণধারণ কোরে দেবতা ও পিতৃগণের তর্পণ এবং বেদচর্চা করতে লাগলেন। অনাবৃষ্টি শেষ হোলে মহর্ষিগণ দেখলেন তারা বেদবিদ্যা ভুলে গেছেন। তারা সারস্বত মুনির কাছে গিয়ে বললেন, আমাদের বেদ পড়াও। সারস্বত বললেন, আপনারা যথাবিধি আমার শিষ্য হন। মহর্ষিরা সারস্বতকে বললেন, তুমি তো বালক। সারস্বত বললেন, যাঁরা অবিধিপূর্বক অধ্যয়ন ও অধ্যাপন করেন তারা উভয়েই পতিত এবং পরস্পরের শত্রু হন। বয়স, পক্ককেশ, বিত্ত বা বন্ধুবাহুল্য থাকলেই লোকে বড় হয় না, যিনি বেদজ্ঞ তিনিই গুরু হবার যোগ্য। তখন ষাট হাজার মুনি সারস্বতের শিষ্যত্ব স্বীকার করলেন।
______________
(ক্রমশ)