মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৭৫
অশ্বত্থামা কর্তৃক ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রৌপদীর পুত্রগণকে হত্যা
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
অশ্বত্থামা কর্তৃক ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রৌপদীর পুত্রগণকে হত্যা
কৃপ ও কৃতবর্মাকে শিবিরে প্রবেশের মুখে দেখে অশ্বত্থামা খুশী হয়ে মৃদুস্বরে বললেন, আমি শিবিরে প্রবেশ কোরে যমের মতো বিচরণ করবো, আপনারা দেখবেন যেন কেউ জীবিত অবস্থায় আপনাদের নিকট থেকে পালিয়ে যেতে না পারে। এই বলে অশ্বত্থামা পিছনের দুয়ার দিয়ে পাণ্ডবদের শিবিরে প্রবেশ করলেন।
ধীরে ধীরে ভিতরে এসে অশ্বত্থামা দেখলেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন উত্তম সুবাসিত শয্যায় ঘুমিয়ে রয়েছেন। অশ্বত্থামা তাকে লাথি মেরে জাগিয়ে তুলে চুল ধরে মাটিতে ফেলে পিষতে লাগলেন। ভয়ে এবং ঘুমের ঘোরে ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হলেন না। অশ্বত্থামা তার বুকে আর গলায় পা দিয়ে চাপতে লাগলেন। তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন অশ্বত্থামাকে নখ দিয়ে আঘাত কোরে অস্পষ্টস্বরে বললেন, আচার্যপুত্র, বিলম্ব করবেন না, আমাকে অস্ত্রাঘাতে বধ করুন, তা হলে আমি পুণ্যলোকে যেতে পারবো। অশ্বত্থামা বললেন, কুলাঙ্গার দুর্মতি, গুরুহত্যাকারী পুণ্যলোকে যায় না, তুমি অস্ত্রাঘাতে মরবার যোগ্য নও। এই বলে অশ্বত্থামা হৃদপিণ্ডের স্থানে গোড়ালির চাপ দিয়ে ধৃষ্টদ্যুম্নকে হত্যা করলেন।
ধৃষ্টদ্যুম্নের আর্তনাদ শুনে স্ত্রী ও রক্ষিগণ জেগে উঠে সেখানে এলো, কিন্তু অশ্বত্থামাকে ভূত মনে কোরে ভয়ে কথা বলতে পারল না। অশ্বত্থামা রথে উঠে পাণ্ডবদের শিবিরে গেলেন। ধৃষ্টদ্যুম্নের নারীদের ক্রন্দন শুনে বহু যোদ্ধা সত্বর এসে অশ্বত্থামাকে বেষ্টন করলেন, কিন্তু সকলেই রুদ্রাস্ত্রে নিহত হলেন। তার পর অশ্বত্থামা উত্তমৌজা ও যুধামন্যুকে বধ করে শিবিরে ঘুমিয়ে থাকা শ্রান্ত ও নিরস্ত্র সকল যোদ্ধাকেই হত্যা করলেন। দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র কোলাহল শুনে জেগে উঠে শিখণ্ডীর সঙ্গে এসে অশ্বত্থামার প্রতি বাণবর্ষণ করতে লাগলেন। অশ্বত্থামা খড়গের আঘাতে দ্রৌপদীর পুত্রগণকে একে একে বধ করলেন, তার পর শিখণ্ডীকেও দ্বিখণ্ডিত করলেন।
শিবিরের রক্ষিগণ দেখল, করালবদনা রক্তবস্ত্র পরিহিতা গলায় রক্তমালাধারিণী কালরাত্রিরূপা কালী তার সহচরীদের সঙ্গে অবির্ভূত হয়েছেন, তিনি গান করছেন এবং মানুষ হাতি ও ঘোড়াদেরকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছেন।
অর্ধেক রাতের মধ্যেই অশ্বত্থামা পাণ্ডব শিবিরের সমস্ত সৈন্য হাতি ও ঘোড়া বধ করলেন। যারা পালাচ্ছিল তারাও কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা কর্তৃক নিহত হোলো। এই হত্যাকাণ্ড শেষ হলে অশ্বত্থামা বললেন, আমরা কৃতকার্য হয়েছি, এখন শীঘ্র রাজা দুর্যোধনের কাছে চলুন, তিনি যদি জীবিত থাকেন তবে তাকে এই সুসংবাদ দেবো।
______________
(ক্রমশ)