Diabetes - 15 in Bengali Health by Yogi Krishnadev Nath books and stories PDF | মিষ্টি নামের তিক্ত রোগ - 15

Featured Books
Categories
Share

মিষ্টি নামের তিক্ত রোগ - 15

# এক বছরের লাইফস্টাইল রোডম্যাপ:

১. প্রথম তিন মাস—

প্রথম সাত দিনের লাইফস্টাইল যেমন ছিল, ঠিক তেমন করেই কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
খাবার, ঘুম, হাঁটা–ব্যায়াম, উপবাস— সব নিয়ম বজায় রাখতে হবে।
তিন মাস শেষে HbA1c টেস্ট করতে হবে। নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, রিপোর্ট একদম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

২. চতুর্থ মাস থেকে পরবর্তী আট মাস পর্যন্ত—

একই লাইফস্টাইল চালিয়ে যেতে হবে। তবে এই সময় থেকে অল্প অল্প করে ডাল জাতীয় খাবার খাদ্য তালিকায় যোগ করতে পারবে। পনিরও খেতে পারো।
তবে সতর্ক থাকতে হবে— ডালও পরিমিত মাত্রায় খেতে হবে, কারণ এতেও কার্বোহাইড্রেট আছে।

৩. অসতর্কতায় নিয়ম ভঙ্গ হয়ে গেলে ?

কখনো হঠাৎ একদিন নিয়ম ভঙ্গ হয়ে গেলেও চিন্তার কিছু নেই।
ততদিনে তোমার শরীর এতটাই সক্ষম হয়ে উঠবে যে, সে নিজেই সেই ছোট্ট ভুলটাকে ম্যানেজ করে নিতে পারবে।
তবে বারবার ভুল করলে শরীর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে— এটা মনে রাখতে হবে।

এক কথায়, পুরো এক বছর এই রুটিন মেনে চললে শরীর ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ভুলে যাবে এবং সুগার পুরোপুরি রিভার্স হয়ে যাবে।

তোমার সঙ্গে কথা বলা এখানেই আমার শেষ। এবার আমি সুগার রিভার্স করার সম্পূর্ণ ফুড প্ল্যান সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে চাই।





# সুগার রিভার্সালের সম্পূর্ণ ফুড প্ল্যান:


*বিকল্প ১: দিনে ২ বেলা খাবার*

এটা সবচেয়ে কার্যকরী ফুড প্ল্যান– ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ভাঙতে সাহায্য করে।

দুপুর (প্রথম মিল – ফাস্টব্রেক+লাঞ্চ)

৬–৮টি ভিজানো বাদাম (খোসা ছাড়ানো) + ১ চামচ ভিজানো চিয়া/তুলসী বীজের জল।

বড় এক বাটি সালাদ। বিট, শসা, গাজর, টমেটো, বাঁধাকপি, রঙিন ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ কুচি, ধনেপাতা, লেবুর রস, পিঙ্ক সল্ট, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল মিশিয়ে।

প্রোটিন: মাছ/ডিম/দেশি মুরগি/মাশরুম।

এক বাটি লো জিআই ভাত বা ২টা লো জিআই আটার রুটি (সর্বোচ্চ সীমা)।


রাত (ডিনার – সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শেষ করতে হবে। পারলে সূর্য ডোবার সাথে সাথেই)।

হালকা শাকসবজি ভাজি/সুপ।

১/২টা লো জিআই রুটি অথবা ছোট এক বাটি লো জিআই ভাত।

সামান্য প্রোটিন (মাছ/ডিম/মুরগি)।

চাইলে ছোট এক বাটি ডাল (কোনোভাবেই বেশি নয়)।

শেষে এক চামচ ফ্ল্যাক্সসিড বা কুমড়োর বীজ।



*বিকল্প ২: দিনে ৩ বেলা খাবার*

 (যাদের শুরুতে একেবারে ২ বেলায় নামা কষ্টকর মনে হয়, এটা তাদের জন্য)

সকাল (ব্রেকফাস্ট):

রাতে ভিজিয়ে রাখা ৬/৮টা কাঠ বাদাম, আখরোট ২ টুকরো, কুমড়োর/সূর্যমুখীর বীজ। চাইলে সেদ্ধ ডিম (১–২টি)। ধন্বন্তরী চা / ব্ল্যাক কফি।


দুপুর (লাঞ্চ):

বড় এক বাটি সালাদ (উপরের মতো)।

প্রোটিন: মাছ/ডিম/দেশি মুরগি/মাশরুম।

এক বাটি লো জিআই ভাত বা ২টা লো জিআই আটার রুটি।


রাত (ডিনার – ৭টার মধ্যে শেষ)।

শাকসবজির স্যুপ/হালকা ভাজি। পরিমিত পরিমাণে প্রোটিন। পর্যাপ্ত সব্জি দিয়ে ১/২টা রুটি অথবা ভাত।



কখনোই খাবেন না:

১. ভাত–রুটি–ডাল একসঙ্গে থালা ভরে (কার্ব ওভারলোড)।
২. খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে জল।
৩. রাতে ভাত/ভারী খাবার (অবশ্যই এড়াতে হবে)।



# গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম:

খাওয়ার এপিসোড = ২ বা সর্বোচ্চ ৩ বেলা। অর্থাৎ দিনে দুই থেকে তিনবারের বেশি খাওয়া যাবে না। এই নিয়মটা শুধু ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনারের জন্য নয়। এর ফাঁকে অন্য সময় একটা বিচিও মুখে দেওয়া যাবে না। তবে গ্রিন টি, লেবুর জল এসব খাওয়া যাবে। মোদ্দা কথা হচ্ছে ইনসুলিন সিক্রেশন হবে এই ধরনের কোনো কিছুই খাওয়া যাবে না।

রাত ৮টার পর কোনোভাবেই খাবার নয়।

খাবার সবসময়ই ভালো করে চিবিয়ে খেতে হবে। 

খাবারের পর অন্তত ১৫–২০ মিনিট হাঁটা।

খাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে জল নয়, তার পর যত খুশি জল।


খাবার খাওয়ার মূলমন্ত্র “কম খাও, সঠিক খাও, সময় মেনে খাও।”
এই তিন মন্ত্রই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ভাঙার আসল চাবিকাঠি।



এই পর্বে আমরা দেখেছি— সুগার নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু খাদ্য নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনই সবচেয়ে বড় ওষুধ।
ভোরে ওঠা, প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া, সূর্যের আলো গ্রহণ করা, নিয়মিত হাঁটা, সময়মতো খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম আর নিরুদ্বেগ মন— এসব মিলেই আমাদের শরীরকে সুগার মুক্ত করে।

প্রথম সাত দিনের অভ্যাস দিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের যাত্রা, আর সেই অভ্যাসগুলো যদি তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর ধরে চালিয়ে যাই, তবে শরীর নিজেই পুরোনো রোগ ভুলে নতুন করে বাঁচতে শেখে যাবে।
হ্যাঁ, কোনো কোনো দিন হয়তো ভুল হবে, হয়তো নিয়ম মানা সম্ভব হবে না, কিন্তু তাতে ভয় নেই। শরীর তখন এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে, সে নিজেই সেই ভুলকে সামলে নিতে পারে।

এই পর্ব থেকে মূল শিক্ষা হলো—
সঠিক খাদ্যাভ্যাসের চেয়েও বড় হলো সঠিক জীবনযাপন।
কারণ নিয়মিত ও শৃঙ্খল জীবনই আমাদের HbA1c কমায়, শরীরকে ইনসুলিন সেনসিটিভ করে তোলে, আর আমাদের মুক্তির রাস্তায় নিয়ে যায়।

আজ থেকে প্রতিটি সকাল যদি হয় নতুন সূর্যের মতো, প্রতিটি রাত যদি হয় শান্ত ঘুমের মতো— তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমরা বলতে পারব: “ডায়াবেটিস আমাকে নয়, আমি ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণ করছি।”





# কিছু সতর্কবার্তা ও বিশেষ পরামর্শ:  


ডায়াবেটিস রিভার্স করার যাত্রা একেবারেই সম্ভব।  
তবে সবার জন্য একই নিয়ম চলবে না। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।  


# ফাস্টিং করার আগে যাদের বাড়তি সতর্কতা দরকার—  
- গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মা।  
- শিশু ও কিশোর।  
- অতিরিক্ত বয়স্ক বা দুর্বল শরীরের মানুষ।  
- যারা দীর্ঘদিন ধরে ইনসুলিন ইনজেকশন ব্যবহার করছেন।  
- গুরুতর কিডনি, লিভার বা হার্টের রোগে ভুগছেন।  

এরা ফাস্টিং শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন।  



# ওষুধ/ইনসুলিনের ব্যাপারে—  

- কখনোই হঠাৎ করে ওষুধ বা ইনসুলিন বন্ধ করা যাবে না।  
- লাইফস্টাইল বদলালে সুগার নেমে আসবেই। তখন ধীরে ধীরে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ কমিয়ে দিতে হবে। 



# ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সতর্কতা—  

- যাদের হাড়ের ব্যথা, হার্টের সমস্যা, বা গুরুতর অসুস্থতা আছে, তাদের জন্য হাই-ইনটেনসিটি ব্যায়াম ঝুঁকিপূর্ণ।  
- এরা হালকা হাঁটা, যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং দিয়ে শুরু করবেন।  



# টেস্টের গুরুত্ব— 
- শুধু একদিন সুগার কমলেই ভাবা যাবে না যে ডায়াবেটিস চলে গেছে।  
- প্রতি ৩ মাস অন্তর *HbA1c টেস্ট* করা বাধ্যতামূলক।  
- টানা ৩টি রিপোর্ট নরমাল এলে ধরে নেওয়া যায় ডায়াবেটিস রিভার্স হয়েছে।  
- নিশ্চিত প্রমাণ পেতে হবে *GTT (Glucose Tolerance Test)* দিয়ে।  

# GTT টেস্ট কী ?  

ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য যেসব রক্তপরীক্ষা করা হয় তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট হলো *Glucose Tolerance Test (GTT)*।  
এটিকে অনেক সময় *OGTT (Oral Glucose Tolerance Test)* নামেও ডাকা হয়।  

এই পরীক্ষায় দেখা হয়— শরীর কতটা দক্ষভাবে অতিরিক্ত গ্লুকোজ সামলাতে পারে।  
সাধারণত পরীক্ষার দিন রোগীকে রাতভর উপোস থাকতে হয়।  
প্রথমে ফাস্টিং ব্লাড সুগার মাপা হয়।  
তারপর রোগীকে নির্দিষ্ট পরিমাণে (সাধারণত ৭৫ গ্রাম) গ্লুকোজ পান করানো হয়।  
এরপর নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ২ ঘণ্টা) পর আবার রক্ত নিয়ে ব্লাড সুগার মাপা হয়।  

যদি দেখা যায় ২ ঘণ্টা পরে রক্তের গ্লুকোজ স্বাভাবিক জায়গায় রয়ে গেছে, তাহলে বোঝা যায় শরীরের ইনসুলিন সিস্টেম সঠিকভাবে কাজ করছে। তখনই বোঝা যায় ডায়াবেটিস রিভার্স হয়ে গেছে।

বিশেষ আনন্দের সংবাদ হচ্ছে "মিষ্টি নামের তিক্ত রোগ" ধারাবাহিক লেখাটি এখন বই আকারেও এসে গেছে। অ্যামাজন বা ফ্লিপকার্ট থেকে এই বইটি সংগ্রহ করতে পারেন।