পার্ট_১
"কখনো ছেড়ে যাব না"
রাত তখন প্রায় বারোটা। শহর ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু ফেলিক্সের ঘরে আলো জ্বলছে। টেবিলের ওপর বিদেশি কোম্পানির অফার লেটার, আর তার পাশেই আলিশার হাতের লেখা চিরকুট—দুটোই একই সঙ্গে ওকে টানছে, আবার ছিঁড়ে দিচ্ছে।
“আমরা কখনো একে অপরকে ছেড়ে যাব না”—
এই কথাটা আলিশা বলেছিল এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে।
সেদিন আলিশার চোখে কোনো ভয় ছিল না। কারণ সে ভালোবাসলে পুরোটা দিয়ে ভালোবাসে।
ফেলিক্সের জীবন কখনোই কঠিন ছিল না। বড় বাড়ি, সচ্ছল পরিবার, পড়াশোনার জন্য কোনো চিন্তা নেই। তার বাবা বিশ্বাস করেন—জীবনে সবচেয়ে বড় প্রেম হলো সফলতা। আর মা বিশ্বাস করেন—ছেলের ভবিষ্যৎ মানেই সামাজিক মান।
অন্যদিকে আলিশা—মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র মেয়ে। তার জীবন হিসাব করে চলা শিখিয়েছে। বাবার ওষুধের টাকা, মায়ের নীরব দুশ্চিন্তা—এসবের মাঝেই সে বড় হয়েছে। তার কাছে ভালোবাসা বিলাসিতা নয়, আশ্রয়।
ফেলিক্স আর আলিশার পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে। একই বইয়ের জন্য দু’জনের হাত একসাথে এগিয়ে গিয়েছিল। সেই স্পর্শটাই ধীরে ধীরে জীবনের সাথে জড়িয়ে যায়।
একদিন আলিশা জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি কি সত্যিই আমার পাশে থাকবে? সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলেও?”
ফেলিক্স বিন্দুমাত্র না ভেবে বলেছিল,
“আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না।”
সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েই গল্পটা শুরু হয়েছিল।
আজ সেই প্রতিশ্রুতিটাই তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে।
ফেলিক্স জানে—তার পরিবার কখনোই আলিশার মতো একটি সাধারণ মেয়েকে মেনে নেবে না। তার মা ছেলের প্রেমিকায় “পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড” খোঁজেন, আর বাবা খোঁজেন “সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা”।
আজ প্রথমবার ফেলিক্স বাড়িতে আলিশার কথা তুলেছিল।
ড্রয়িংরুমে নীরবতা নেমে এসেছিল।
“একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত মেয়ে?”—মা ঠান্ডা গলায় বলেছিলেন।
“তুমি কি জানো, সমাজ কী বলবে?”
বাবা চোখ তুলে তাকিয়ে শুধু এটুকু বলেছিলেন,
“ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না, ফেলিক্স।”
ফেলিক্স তখনো কিছু বলেনি। চুপ করে বসে ছিল। আর সেই চুপটাই ছিল প্রথম ভাঙন।
এই সময় আলিশা নিজের ঘরে বসে বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সে জানে না, ঠিক এই মুহূর্তে অন্য এক ঘরে তার ভালোবাসার বিচার চলছে।
রাত গভীর হলে আলিশা ফোন করল।
“সব ঠিক আছে তো?”
ফেলিক্স কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আমি চেষ্টা করছি।”
এই “চেষ্টা” শব্দটা আলিশার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ভয় ঢুকিয়ে দিল।
কারণ সে জানে—
যে ভালোবাসাকে প্রমাণ করতে হয়,
সে ভালোবাসা একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।ফোনটা কেটে গেল।
আলিশা বেশ কিছুক্ষণ হাতে ফোন নিয়েই বসে রইল। ফেলিক্স কিছু বলেনি—কিন্তু না-বলার ভেতরেই সব বলা হয়ে গেছে।
ঘরের ভেতর বাবার কাশির শব্দ। আলিশা উঠে গিয়ে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিল। বাবা তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“তোর চোখ লাল কেন মা?”
আলিশা হাসল। এই হাসিটা সে রপ্ত করেছে—ভাঙা চোখ নিয়েও হাসতে হয়, কারণ এই বাড়িতে তার ভাঙার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে ফেলিক্স নিজের ঘরে একা। অফার লেটারটা আবার হাতে নিল। বেতন, সুযোগ, ভবিষ্যৎ—সবই নিখুঁত। ঠিক যেরকম তার পরিবার চায়।
শুধু আলিশা নেই।
সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—
“আমি তো ওকে ছেড়ে দিচ্ছি না… শুধু একটু সময় চাই।”
কিন্তু সত্যিটা সে নিজেও জানে—
সময় কখনো আলাদা হয়ে আসে না,
সময় আসে সিদ্ধান্ত হয়ে।
পরদিন সকালে ফেলিক্সের মা নাশতার টেবিলে বললেন,
“তোমার খালার মেয়ে আসছে আজ। খুব স্মার্ট, খুব ভদ্র। বিদেশে পড়েছে।”
ফেলিক্স চুপ করে রইল।
এই চুপই যেন তার সম্মতি।
আর আলিশা?
সে সকালে কলেজে গেল। ক্লাসে বসে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকল, কিন্তু কিছুই বুঝল না। বন্ধুরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছে—কে কোথায় যাবে, কে কী হবে।
আলিশা জানে, তার ভবিষ্যৎ মানে শুধু সে নয়—তার বাবা-মাও।
ফেলিক্স বিকেলে দেখা করতে চাইল। পুরোনো ক্যাফেটা, যেখানে তারা প্রথম প্রতিজ্ঞা করেছিল।
ফেলিক্স বলল,
“আমার পরিবার সময় চাচ্ছে।”
আলিশা ধীরে বলল,
“আর তুমি?”
ফেলিক্স উত্তর দিতে পারল না।
এই নীরবতার মধ্যেই আলিশা বুঝে গেল—
সে একাই লড়ছে।
“তুমি যদি এগোতে চাও, আমি বাধা হব না”—আলিশা বলল।
কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভেতরটা ভেঙে চূর্ণ।
ফেলিক্স তাকাল।
এই প্রথম সে বুঝল—
ভালোবাসা হারানো মানে কান্না নয়,
ভালোবাসা হারানো মানে কাউকে শক্ত হতে দেখা।
আলিশা উঠে দাঁড়াল।
“আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনি।
কিন্তু তুমি যেদিন আমাকে বোঝা ভাবলে,
সেদিন থেকেই আমি একা।”
সে চলে গেল।
ফেলিক্স বসে রইল।
চারপাশে মানুষ, শব্দ—সবকিছু ছিল।
শুধু সেই মানুষটা ছিল না।যাকে সে বলেছিল—“কখনো ছেড়ে যাব না।”সে ধীরে চেয়ার থেকে উঠল। কফির কাপটা এখনো টেবিলে রাখা—ঠান্ডা, ঠিক আলিশার গলার স্বরের মতো। কেউ লক্ষ করেনি, কিন্তু ফেলিক্স বুঝেছে—কিছু চলে গেলে তার জায়গাটা হঠাৎ করেই খুব বড় হয়ে যায়।
রাতে বাড়ি ফিরলে মা জিজ্ঞেস করলেন,
“আজ এত দেরি কেন?”
ফেলিক্স উত্তর দিল,
“কাজ ছিল।”
এই ‘কাজ’ শব্দটার ভেতরে সে আলিশাকে ঢেকে রাখল।
পরদিন থেকে সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার অভিনয় শুরু হলো।
অফিস, মিটিং, প্রস্তুতি—ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছে। পরিবারের চোখে ফেলিক্স এখন দায়িত্ববান ছেলে।
এক সন্ধ্যায় বাবা বললেন,
“তুমি ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছ। জীবন আবেগ দিয়ে চলে না।”
ফেলিক্স মাথা নেড়েছিল।
কিন্তু মাথা নড়ানো মানে মন মানা নয়।
অন্যদিকে আলিশা নিজের ঘরে বসে নতুন করে জীবন গুছোতে শুরু করেছে। সে জানে—এই শহরে কেউ কারো জন্য থেমে থাকে না। বাবার ওষুধ, মায়ের চিন্তা—এই বাস্তবতার মধ্যে ভালোবাসার বিলাসিতা আর রাখা যায় না।
একদিন আলিশা তার পুরোনো খাতাটা খুলল। ভেতরে ফেলিক্সের হাতের লেখা—
“যদি কখনো ভেঙে পড়ো, আমি থাকব।”
সে খাতাটা বন্ধ করে রাখল।
কিছু স্মৃতি পড়া যায় না, সহ্য করা যায় না।
মাস কেটে গেল। ফেলিক্স বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন পরিচয়। সবাই বলছে—
“ভাগ্যবান।”
কেউ জিজ্ঞেস করছে না—
কাকে ফেলে যেতে হচ্ছে?
বিদেশ যাওয়ার আগের রাতে ফেলিক্স ছাদে দাঁড়াল। শহরের আলো ঠিক আগের মতোই জ্বলছে। কোথাও আলিশা হয়তো এখনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে—এই ভাবনাটা হঠাৎ করে তার বুক চেপে ধরল।
সে ফোনটা হাতে নিল। নামটা স্ক্রিনে উঠল—
আলিশা।
আঙুল থেমে গেল।
কল করল না।
কারণ সে জানে—
কিছু মানুষকে ডাকা যায় না,
যাদের একদিন নিজের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।পরদিন সকালেই বাড়িতে ব্যস্ততা। সবাই তার বিদেশযাত্রা নিয়ে উত্তেজিত। মা আত্মীয়দের ফোন করছেন, বাবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দিচ্ছেন। এই বাড়িতে কেউ জানে না—একটা সম্পর্ক আজীবনের মতো চুপ করে গেছে।
মা বললেন,
“ওখানে গিয়ে মন দিয়ে কাজ করো। এসব আবেগে জড়িও না।”
ফেলিক্স মাথা নেড়েছিল।
এই নেড়ে দেওয়াই এখন তার সবচেয়ে বড় অভ্যাস।
অন্যদিকে আলিশা আজ প্রথম দিন নতুন চাকরিতে। ছোট একটি স্কুলে পড়ায়। বেতন বেশি না, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা চেষ্টা। ক্লাসে ঢোকার আগে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলল,
“তুই পারবি।”
এই কথাটা বলার জন্য তার এখন আর কাউকে দরকার হয় না।
দিনগুলো গড়িয়ে যায়। সময় সবকিছুকে ঢেকে দেয়, কিন্তু সব ভুলিয়ে দেয় না। ফেলিক্স বিদেশে ব্যস্ত—কাজ, প্রজেক্ট, নতুন মানুষ। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম আসে না। তখন তার মনে পড়ে—একটা সাধারণ প্রশ্ন,
“খেয়েছ?”
এই প্রশ্নটা এখন আর কেউ করে না।
একদিন মা ফোন করে বললেন,
“একটা ভালো প্রস্তাব এসেছে। মেয়েটা আমাদেরই পরিচিত।”
ফেলিক্স বলল,
“দেখা যাবে।”
এই ‘দেখা যাবে’ শব্দটাই যেন তার সম্মতির আধা-স্বাক্ষর।
আলিশা meanwhile বাবার চিকিৎসার খরচ সামলাচ্ছে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে মা বললেন,
“তুই অনেক বদলে গেছিস মা।”
আলিশা হেসে বলল,
“সময় মানুষকে বদলাতে শেখায়।”
মা বুঝলেন না—এই বদলের পেছনে কতটা চুপচাপ কষ্ট লুকিয়ে আছে।
বছর কেটে গেল।
একদিন হঠাৎ করে শহরের এক পরিচিত মোড়ে ফেলিক্স দাঁড়িয়ে পড়ল—ছুটি নিয়ে দেশে এসেছে। একই রাস্তা, একই ভিড়। শুধু কিছু মানুষ আর নেই।
হঠাৎ চোখে পড়ল—
আলিশা।
হাতভরা বই, চোখে ক্লান্তি, মুখে শান্ত এক দৃঢ়তা। তাকে দেখে মনে হলো—সে আর অপেক্ষা করে না।
ফেলিক্স ডাকতে গিয়েও ডাকল না।
কারণ সে জানে—
ডাকা মানে ফিরিয়ে আনা নয়,
ডাকা মানে আবার নিজের অপরাধটা মনে করিয়ে দেওয়া।
আলিশা সামনে এগিয়ে গেল।
ফেলিক্স পেছনেই রইল।
কিছু মানুষ সামনে হাঁটে,
আর কিছু মানুষ আজীবন
পেছনে পড়ে থাকে—
নিজের সিদ্ধান্তের ভার নিয়ে।ফেলিক্স সেদিন আর আলিশার দিকে ফিরে তাকায়নি। কারণ তাকালেই তাকে স্বীকার করতে হতো—আলিশা এখন আর তার অপেক্ষায় নেই। সে এগিয়ে গেছে, নিজের মতো করে।
সে দেশে থাকা কয়েকটা দিন বাড়িতে কাটাল। আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, মায়ের গর্ব, বাবার নিশ্চিন্ত মুখ—সবকিছু মিলিয়ে মনে হলো, সমাজের চোখে সে সফল। শুধু নিজের চোখে সে ক্লান্ত।
এক রাতে মা বললেন,
“ও মেয়েটাকে ভুলে যাও। এসব সম্পর্ক ভবিষ্যৎ নষ্ট করে।”
ফেলিক্স কোনো উত্তর দিল না।
ভুলে যাওয়া জিনিস নয়,
ভুলে থাকার ভান করাই মানুষ শেখে।
বিদেশে ফিরে গেলে কাজ আরও বেড়ে গেল। পদোন্নতি, সম্মান—সব পেল সে। সহকর্মীরা বলল,
“You made the right choice.”
ফেলিক্স হাসল।
এই হাসিটা সে আয়নার সামনে রপ্ত করেছে।
অন্যদিকে আলিশা ধীরে ধীরে নিজের জায়গা বানাচ্ছে। স্কুলে বাচ্চারা তাকে “মিস আলিশা” বলে ডাকে। বাবা আগের চেয়ে একটু ভালো আছেন। মা সন্ধ্যায় নিশ্চিন্তে চা খেতে পারেন।
একদিন আলিশা স্কুলের নোটিস বোর্ডে নিজের নাম দেখে থমকে দাঁড়াল—
“Best Teacher Award (Junior Category)”
সে চোখ বন্ধ করল।
এই অর্জনটা সে একা করেছে।
সেদিন রাতে আলিশা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। হঠাৎ মনে হলো—কেউ নেই, তবু শূন্য নয়। এটা প্রথমবারের মতো ভালো লাগল।
ফেলিক্সের জীবনে meanwhile বিয়ের তারিখ ঠিক হলো। পরিবারের পছন্দে। সবকিছু সুন্দর, পরিকল্পিত। সে কাউকে বলে না—রাতে ঘুমানোর আগে একটাই নাম মাথায় আসে।
বিয়ের আগের রাতে ফেলিক্স জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করল—
“আমি কি সত্যিই জিতেছি?”
কোনো উত্তর এলো না।শুধু একজন মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নিয়েছে,
আর অন্যজন শিখেছে—
ভালোবাসা না থাকলেও
জীবন থেমে থাকে না।ফেলিক্স জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। সুসজ্জিত ঘর, আলো, ফুল—সবকিছু প্রস্তুত। আগামীকাল সে একজন “সেটেলড মানুষ” হবে। সমাজের ভাষায়, সে ঠিক জায়গায় পৌঁছেছে।
কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা জায়গা খালি পড়ে আছে—
যেটা কোনো অর্জন দিয়ে ভরাট হয় না।
বিয়ের দিন সব ঠিকঠাক হলো। অতিথিদের হাসি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, অভিনন্দন। ফেলিক্স হাসল, কথা বলল, দায়িত্ব পালন করল। সে শিখে গেছে—কীভাবে নিজের অনুভূতিকে ভদ্রভাবে আড়াল করতে হয়।
নতুন জীবনের প্রথম রাতে সে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল। অন্য এক জানালার কথা মনে পড়ল—যেখানে একসময় আলিশা দাঁড়িয়ে থাকত, অপেক্ষা নয়, বিশ্বাস নিয়ে।
সে চোখ বন্ধ করল।
এই স্মৃতিটুকু ছাড়া তার আর কিছু নেই।
অন্যদিকে আলিশার জীবন চলতে থাকে। ধীরে, স্থিরভাবে। বাবার চিকিৎসা শেষের দিকে, মায়ের মুখে আগের মতো দুশ্চিন্তার রেখা নেই। স্কুলের বাচ্চারা তাকে আঁকা কার্ড দেয়—“আমরা আপনাকে ভালোবাসি, ম্যাম।”
এক সন্ধ্যায় মা আলিশাকে বললেন,
“তোর জন্য একটা প্রস্তাব এসেছে।”
আলিশা অবাক হলো না। শুধু বলল,
“আমি এখন ঠিক আছি মা।”
এই ‘ঠিক আছি’ কথাটার মানে—
সে আর কাউকে প্রয়োজন বলে ধরে নেয় না।
কয়েক বছর পর, শহরের এক অনুষ্ঠানে ফেলিক্স আর আলিশা আবার মুখোমুখি হলো। দু’জনেই থমকে গেল। সময় তাদের আলাদা করে দিয়েছে, কিন্তু চেনার ক্ষমতা কাড়েনি।
ফেলিক্স বলল,
“তুমি ভালো আছো?”
আলিশা হালকা হাসল।
“হ্যাঁ। এখন আমি সত্যিই ভালো আছি।”
এই ‘সত্যিই’ শব্দটা ফেলিক্সের বুকের ভেতর কোথাও কেঁপে উঠল।
আর কিছু বলার ছিল না।
কারণ কিছু সম্পর্কের শেষ হয় কথায় নয়,
শেষ হয় বোঝাপড়ায়।
দু’জন দু’দিকে চলে গেল।
কেউ ফিরে তাকাল না।
*****
পার্ট_২
"আলিশার জীবনের নতুন অধ্যায়"
আলিশা সেদিন অনেকটা হেঁটেছিল। কোথায় যাবে জানত না, শুধু জানত—থামলে ভেঙে পড়বে। বাড়ি ফিরে মা চায়ের কাপ এগিয়ে দিলেন।
“আজ অনুষ্ঠান কেমন ছিল?”—মা জিজ্ঞেস করলেন।
আলিশা হালকা গলায় বলল,
“ভালো।”
এই ‘ভালো’ শব্দের ভেতরে অনেক না-বলা ছিল।
কয়েক সপ্তাহ পর প্রস্তাবটা এলো।
ছেলেটার নাম ইমরান। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করে। পরিবার সাদামাটা, কথা কম, ব্যবহার ভদ্র। সবচেয়ে বড় কথা—তারা আলিশার বাবার অসুস্থতা আর আলিশার দায়িত্বগুলো জেনে এসেছিল।
ইমরানের মা বলেছিলেন,
“মেয়ে মানুষটা বুঝদার হলেই আমাদের জন্য যথেষ্ট।”
এই কথাটা আলিশার বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক শান্তি এনে দিল। এখানে তাকে প্রমাণ করতে হবে না—সে কোথা থেকে এসেছে।
আলিশা ইমরানের সঙ্গে একবার দেখা করল। কোনো নাটকীয়তা নেই। শুধু চা, কয়েকটা সাধারণ প্রশ্ন।
ইমরান বলেছিল,
“আমি পারফেক্ট মানুষ নই। কিন্তু চেষ্টা করব, তোমাকে একা অনুভব না করাতে।”
আলিশা মাথা নুইয়ে শুনছিল।
এই প্রতিশ্রুতি আগের মতো বড় নয়,
কিন্তু অনেক বেশি বাস্তব।
সেদিন রাতে মা জিজ্ঞেস করলেন,
“তোর কী মনে হয় মা?”
আলিশা একটু ভেবে বলল,
“আমি আর এমন কাউকে চাই না,
যাকে ধরে রাখার জন্য লড়তে হয়।”
মা কিছু বললেন না। শুধু মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।কিছুদিনের পর,বিয়েটা খুব সাধারণ হলো। অল্প মানুষ, কোনো জাঁকজমক নেই। আলিশা আয়নায় তাকিয়ে দেখল—সে কাঁদছে না। চোখে ভয় নেই, উত্তেজনাও না। শুধু একধরনের প্রস্তুতি।
এই বিয়ে ভালোবাসার উচ্ছ্বাস নয়,
এই বিয়ে বোঝাপড়ার সিদ্ধান্ত।
বিয়ের আগে বাবা আলিশার হাত ধরে বললেন,
“তুই অনেক সহ্য করেছিস মা।”
আলিশা হেসে বলল,
“এখন আর সহ্য না করে বাঁচতে শিখব।”
ইমরান পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল। সে কিছু বলেনি, শুধু আলিশার দিকে তাকিয়েছিল—একজন মানুষের মতো, দায়িত্বের মতো নয়।
বাসর রাতে ইমরান বলল,
“তোমার অতীত নিয়ে আমি ভয় পাই না।
শুধু চাই—আমাদের ভবিষ্যৎটা সৎ হোক।”
আলিশা প্রথমবার গভীর নিঃশ্বাস নিল।
এই ঘরে তাকে প্রমাণ দিতে হবে না—
সে কাকে ভালোবেসেছিল।ভালোবাসা সবসময় আগুনের মতো আসে না।
কখনো কখনো আসে
এক কাপ চায়ের মতো—
নীরব, উষ্ণ, নির্ভরযোগ্য।
আলিশা জানে—
এই বিয়েতে সে হার মানেনি।
সে শুধু এমন একটা জীবন বেছে নিয়েছে
যেখানে তাকে একা ফেলে দেওয়া হবে না।
আর ফেলিক্স?
সে হয়তো কোথাও এখনো প্রশ্ন খুঁজছে।
কিন্তু আলিশা আর উত্তর হয়ে থাকতে চায় না
কারো না-বলা প্রশ্নের।
বিয়ের পরের দিনগুলো খুব সাধারণ ছিল। ইমরান সকালে অফিসে যায়, আলিশা স্কুলে। সন্ধ্যায় একসাথে চা। কোনো নাটক নেই, কোনো বড় প্রতিশ্রুতিও না। কিন্তু আছে—নিশ্চিন্ত থাকা।
একদিন আলিশা হঠাৎ খেয়াল করল, সে আর অপেক্ষা করে না। ফোন বাজলো কি না, কেউ কথা রাখবে কি না—এই চিন্তাগুলো তার দিন থেকে সরে গেছে।
ইমরান একদিন বলল,
“তুমি চুপ থাকলে আমি ভয় পাই না।
তুমি চুপ থাকলে আমি পাশে থাকি।”
এই কথাটায় আলিশা বুঝল—
ভালোবাসা সবসময় শব্দ চায় না।
সময় গড়াল। বাবার স্বাস্থ্যের উন্নতি হলো। মা আর আগের মতো দুশ্চিন্তায় থাকেন না। আলিশা বুঝল—সে শুধু কারো স্ত্রী হয়নি, সে এখনো নিজের জায়গাটা ধরে রেখেছে।
এক সন্ধ্যায় আলিশা পুরোনো বইয়ের তাক গোছাতে গিয়ে একটা খাতা পেল। ভেতরে ফেলিক্সের লেখা লাইনগুলো। সে খাতাটা খুলল, আবার বন্ধ করল। রেখে দিল না, ফেলেও দিল না।
কিছু স্মৃতি রাখা যায়,
কিন্তু বয়ে বেড়ানো যায় না।
অন্যদিকে ফেলিক্স একা বসে ছিল তার অ্যাপার্টমেন্টে। ক্যারিয়ার ঠিক আছে, পরিবার খুশি। কিন্তু মাঝে মাঝে তার মনে হয়—সে সব ঠিক করলেও, কোথাও কিছু অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
সে জানে, আলিশাকে আর ডাকা যাবে না।
আর ডাকার দরকারও নেই।
"অনেক বড়ো টুইস্ট "
আলিশা খাতাটা আবার হাতে নিল।
এটা ফেলিক্সের হাতের লেখা—সে ভুলতে পারেনি। কিছু লেখার ভাঁজে সময় জমে থাকে, যেমন কিছু মানুষের নাম হৃদয়ে জমে থাকে।
খাতার শেষ পাতাটা সে আগে কখনো পড়েনি।
সেদিন হঠাৎ করেই চোখে পড়ল।
সে পড়তে শুরু করল—
**“যদি কোনো একদিন আমাকে ছেড়ে যেতে হয়,
তাহলে জেনে রেখো—
সেটা ভালোবাসা কমে যাওয়ার জন্য নয়,
বরং সাহস কমে যাওয়ার জন্য।
আমি হয়তো তোমাকে হারাব,
কিন্তু তুমি যেন নিজেকে না হারাও।
যদি কখনো এমন একটা জীবন পাও
যেখানে তোমাকে একা থাকতে হবে না—
সেই জীবনটা বেছে নিও।
আমি হয়তো সেখানে থাকব না,
কিন্তু তোমার ভালো থাকাটা
আমার সবচেয়ে বড় জয় হবে।”**
আলিশার চোখ ভিজে উঠল।
কান্না নয়—এক ধরনের বোঝাপড়া।
এই লাইনগুলো লেখা হয়েছিল
তাদের বিচ্ছেদের আগেই।
ফেলিক্স জানত।
সে জানত—সে পারবে না।
আলিশা খাতাটা বন্ধ করল। ধীরে আলমারির এক কোণে তুলে রাখল। পুড়িয়ে ফেলল না, ছুঁড়ে ফেললও না।
কারণ কিছু মানুষকে ঘৃণা করা যায় না,
শুধু জীবন থেকে সরিয়ে রাখতে হয়।
ইমরান পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল,
“সব ঠিক তো?”
আলিশা হাসল।
একটা শান্ত, পূর্ণ হাসি।
“হ্যাঁ,” সে বলল,
“সব ঠিক।”
এই প্রথম সে জানল—
ফেলিক্স তাকে ছেড়ে গিয়েছিল ঠিকই,
কিন্তু সে কখনোই আলিশাকে ছোট করে দেখেনি।
আর তবু—
আলিশা ঠিক সিদ্ধান্তটাই নিয়েছে।
কারণ বোঝা মানুষকে ভালোবাসা যায়,
জীবন গড়া যায়
শুধু সেই মানুষের সঙ্গে
যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে জানে।
সমাপ্তি🌙।