মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৮১
গান্ধারীর কুরুক্ষেত্র দর্শন এবং কৃষ্ণকে অভিশাপ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
গান্ধারীর কুরুক্ষেত্র দর্শন এবং কৃষ্ণকে অভিশাপ
বেদব্যাসের নির্দেশ অনুসারে ধৃতরাষ্ট্র ও যুধিষ্ঠিরাদি কৃষ্ণকে সামনে রেখে কৌরবনারীদের নিয়ে যান-বাহনে কোরে কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন। সেই যুদ্ধভূমি দেখে নারীরা উচ্চকণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে যান-বাহন থেকে নামলেন। গান্ধারী দূর থেকে দিব্যচক্ষু দ্বারা সেই ভীষণ রণভূমি দর্শন করলেন। তিনি কৃষ্ণকে বললেন, দেখো, একাদশ অক্ষৌহিণীর অধিপতি দুর্যোধন গদা বুকের উপর জড়িয়ে ধরে রক্তাক্তদেহে শুয়ে আছে। আমার পুত্রের মৃত্যু অপেক্ষাও কষ্টকর এই, যে নারীরা তাদের নিহত পতিদের পরিচর্যা করছে। লক্ষ্মণের মা দুর্যোধনপত্নী মাথায় করাঘাত করে পতির বুকে পড়ে আছে। আমার পতিপুত্রহীনা পুত্রবধূরা খোলা চুলে রণভূমিতে দৌড়ে যাচ্ছে। মস্তকহীন দেহ এবং দেহহীন মস্তক দেখে অনেকে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেছে। ওই দেখো, আমার পুত্র বিকর্ণের তরুণী পত্নী মাংসলোভী শকুনদের তাড়াবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। কৃষ্ণ, তুমি নারীদের দারুণ কান্নার আওয়াজ শোনো। শ্বাপদেরা আমার পুত্র দুর্মুখের মুখমণ্ডলের অর্ধেক ভক্ষণ করেছে। কৃষ্ণ, লোকে যাঁকে অর্জুন বা তোমার চেয়ে দেড়গুণ অধিক বীর বলত সেই অভিমন্যুও নিহত হয়েছে, বিরাটের কন্যা উত্তরা শোকে আকুল হয়ে পতির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। উত্তরা বিলাপ কোরে বলছেন, বীর, তুমি আমাদের মিলনের ছ মাসের মধ্যেই নিহত হলে! ওই দেখো, মৎস্যরাজের কুলস্ত্রীগণ অভাগিনী উত্তরাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। হায়, কর্ণের পত্নী জ্ঞানশূন্য হয়ে মাটিতে পড়ে গেছেন, শ্বাপদেরা কর্ণের দেহের অধিকাংশ খেয়ে ফেলেছে। শকুন ও শিয়ালেরা জয়দ্রথের শরীর ভক্ষণ করছে, আমার কন্যা দুঃশলা আত্মহত্যার চেষ্টা করছে এবং পাণ্ডবদের গালি দিচ্ছে। ওই দেখো, দুঃশলা তার পতির মাথা না পেয়ে চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। ওখানে সত্যপ্রতিজ্ঞ ভীষ্ম শরশয্যায় শুয়ে আছেন। দ্রোণপত্নী কৃপী শোকে বিহ্বল হয়ে পতির সেবা করছেন, জটাধারী ব্রাহ্মণগণ দ্রোণের চিতা নির্মাণ করছেন। কৃষ্ণ, ওই দেখো, শকুনিকে শকুনেরা ঘিরে ধরেছে, এই দুর্বুদ্ধিও অস্ত্রাঘাতে নিধনের ফলে স্বর্গে যাবে!
তারপর গান্ধারী কৃষ্ণকে বললেন, তুমি কেন এই যুদ্ধ হতে দিলে? তোমার সামর্থ্য ও বিপুল সৈন্য আছে, উভয় পক্ষই তোমার কথা শুনত, তথাপি তুমি কুরুকুলের এই বিনাশ উপেক্ষা করেছ, তোমাকে এর ফল ভোগ করতে হবে। অন্ধ পতির সেবা কোরে আমি যে তপোবল অর্জন করেছি তার দ্বারা তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি - তুমি যখন কুরুপাণ্ডব জ্ঞাতিদের বিনাশ উপেক্ষা করেছ, তখন তোমার জ্ঞাতিগণেরও বিনাশ হবে। ছত্রিশ বৎসর পরে তুমি জ্ঞাতিহীন অমাত্যহীন পুত্রহীন ও বনচারী হয়ে নিকৃষ্ট উপায়ে নিহত হবে। আজ যেমন ভরতবংশের নারীরা ভূমিতে লুণ্ঠিত হচ্ছে, তোমাদের নারীরাও সেইরূপ হবে।
কৃষ্ণ ঈষৎ হেসে বললেন, দেবী, আপনি যা বললেন তা আমি জানি। যা অবশ্যম্ভাবী তার জন্যই আপনি অভিশাপ দিলেন। বৃষ্ণিবংশের সংহারকর্তা আমি ভিন্ন আর কেউ নেই। যাদবগণ মানুষ ও দেবদানবের অবধ্য, তারা পরস্পরের হাতে নিহত হবেন। কৃষ্ণের এই উক্তি শুনে পাণ্ডবগণ উদবিগ্ন ও জীবন সম্বন্ধে নিরাশ হলেন।
______________
(ক্রমশ)