উত্তরের উত্তরে বরফে ঢাকা এক রাজ্য—যেখানে সূর্য ওঠে, কিন্তু উষ্ণতা নামে না—সেই রাজ্যের মানুষ বিশ্বাস করত, তাদের প্রাসাদের গভীরে কোনো একদিন মানুষের হৃদয় জমে পাথর হয়ে গিয়েছিল, আর সেই শীতলতা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো রাজ্যে। কেউ জানত না সেই গল্পটা কবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু সবাই জানত—রাজপুত্র লুসিয়েন ফ্রস্ট জন্মের পর থেকেই কখনো কাঁদেনি, কখনো হাসেনি, আর কখনো কারও দিকে এমনভাবে তাকায়নি যেন তার চোখে কোনো অনুভূতির ছায়া আছে।
শিশুকালে ধাত্রীরা বলত, তার হাত ধরলে মনে হয় বরফ ছুঁয়েছে, আর বড়ো হতে হতে সেই কথাটা সত্যি হয়ে গেল—তার স্পর্শে উষ্ণতা মরে যায়, তার উপস্থিতিতে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রাজা অলড্রিক বহু চিকিৎসক, জাদুকর, পুরোহিত—সবার দ্বারস্থ হয়েছিলেন, কিন্তু কেউই রাজপুত্রের হৃদয়ের বরফ গলাতে পারেনি। এক সময় রাজা ঘোষণা দিলেন—লুসিয়েন আর কোনো সাধারণ মানুষ নয়, সে এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ, এবং তার দুর্বলতা বলে কিছু থাকতে পারে না।
তাই লুসিয়েন বড়ো হলো যুদ্ধ, ক্ষমতা আর নীরবতার মধ্যে। তার চারপাশে যারা থাকত, তারা তাকে সম্মান করত, ভয় পেত—কিন্তু ভালোবাসত না। কারণ ভালোবাসার জন্য যে উষ্ণতা লাগে, সেটা তার মধ্যে ছিল না। তার পাশে সবসময় থাকত থিও—একজন অদ্ভুত স্বভাবের ছেলেটা, যে রাজপুত্রের নীরবতাকে ভয় না পেয়ে মাঝে মাঝে নিজের মনেই কথা বলত, হাসত, এমনকি মজা করত, যেন লুসিয়েনও একদিন হাসবে।
কিন্তু লুসিয়েন কখনো হাসেনি।
অন্যদিকে, সেই রাজ্যের এক কোণে, বরফের প্রাসাদ থেকে অনেক দূরে, ছোট্ট এক গ্রামে বাস করত আরিয়া ব্লুম। তার জীবনে কোনো রাজকীয়তা ছিল না—ছিল শুধু প্রতিদিনের লড়াই, নিজের আর তার ছোট বোন আইরিসকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। আরিয়া ছিল ঠিক তার নামের মতোই—ফুলের মতো কোমল, কিন্তু অদ্ভুত শক্তিশালী। সে হাসতে জানত, কাঁদতে জানত, ভালোবাসতে জানত—যেগুলো লুসিয়েন কখনোই শেখেনি।
প্রতিদিন সকালে সে বনের ভেতর যেত ঔষধি গাছ সংগ্রহ করতে, গ্রামের অসুস্থ মানুষদের সাহায্য করত, আর রাতে বোনকে জড়িয়ে ধরে গল্প বলত—যেখানে রাজপুত্ররা ভালোবাসতে পারে, আর অভিশাপ ভেঙে যায়।
কিন্তু একদিন, সেই গল্পগুলো হঠাৎ করেই বাস্তব হয়ে উঠল।
সেই দিনটা ছিল অন্য সব দিনের মতোই ঠান্ডা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে আকাশে সূর্যের আলো একটু বেশি ছিল। আরিয়া বনের গভীরে ঢুকে গিয়েছিল—সেখানে যেখানে সাধারণত কেউ যায় না। কারণ শোনা যায়, সেই জায়গায় রাজপরিবারের গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু আরিয়া এসব বিশ্বাস করত না, তার দরকার ছিল শুধু একটা বিরল গাছ, যা আইরিসের অসুখ সারাতে পারে।
সে যখন সেই গাছটা খুঁজে পেল, তখন হঠাৎ চারপাশের বাতাস জমে গেল। পায়ের নিচের মাটি পর্যন্ত শক্ত হয়ে উঠল, আর তার নিঃশ্বাস ধোঁয়ার মতো বেরোতে লাগল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার সামনে এসে দাঁড়াল এক লম্বা ছায়া—কালো পোশাকে ঢাকা, রুপালি চুল, আর চোখে এমন এক শূন্যতা যা দেখে মনে হয় সে কোনো মানুষ নয়।
লুসিয়েন ফ্রস্ট।
আরিয়া প্রথমে ভয় পায়নি—কারণ সে বুঝতেই পারেনি সে কার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু যখন লুসিয়েন তার দিকে তাকাল, তখন তার মনে হলো যেন কেউ তার হৃদয়ের ভেতর পর্যন্ত দেখে ফেলছে—তবুও কিছুই অনুভব করছে না।
“তুমি এখানে কেন?” লুসিয়েনের কণ্ঠ ছিল ঠান্ডা, অনুভূতিহীন।
আরিয়া একটু থেমে বলল, “আমি… গাছটা নিতে এসেছি। আমার বোন অসুস্থ।”
লুসিয়েন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে এর আগে অনেক মানুষ দেখেছে—যারা তার সামনে কাঁপে, ভয় পায়, পালাতে চায়। কিন্তু এই মেয়েটা… সে শুধু কথা বলছে, যেন কিছুই অস্বাভাবিক নয়।
“তুমি জানো না এটা রাজকীয় এলাকা?” সে আবার বলল।
আরিয়া মাথা নেড়ে বলল, “জানি না। কিন্তু যদি এটা না নেই, আমার বোন মারা যাবে।”
এই কথাটা শুনেও লুসিয়েনের মুখে কোনো পরিবর্তন এল না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে—তার ভেতরে কোথাও একটা অচেনা শব্দ উঠল। খুব ছোট, খুব দুর্বল… কিন্তু ছিল।
সে কিছু না বলে গাছটা তুলে এনে আরিয়ার হাতে দিল।
আরিয়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। “ধন্যবাদ,” সে হালকা হাসল।
সেই হাসিটা… অদ্ভুতভাবে উষ্ণ ছিল।
লুসিয়েন প্রথমবারের মতো অনুভব করল—তার হাতের বরফ যেন এক সেকেন্ডের জন্য নরম হয়ে গেল।
আরিয়া চলে গেল, কিন্তু তার হাসিটা রেখে গেল লুসিয়েনের সাথে।
সেদিন রাতে, প্রাসাদের সবচেয়ে ঠান্ডা কক্ষে দাঁড়িয়ে লুসিয়েন নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে বুঝতে পারছিল না কেন তার মনে বারবার সেই মেয়েটার মুখ ভেসে উঠছে। কেন তার বুকের ভেতর সেই অদ্ভুত শব্দটা আবার হচ্ছে।
থিও তখন পাশ থেকে বলল, “আজকে আপনি খুব চুপচাপ… মানে, তার থেকেও বেশি চুপচাপ।”
লুসিয়েন ধীরে বলল, “থিও… যদি কারও উপস্থিতিতে ঠান্ডা কমে যায়… সেটা কী?”
থিও হেসে বলল, “হয়তো… সেটা উষ্ণতা, মাই লর্ড।”
লুসিয়েন কিছু বলল না। কিন্তু তার মনে হলো—এই প্রথমবার, সে কিছু একটা অনুভব করতে চাইছে।
আর সেই চাওয়াটাই… তার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস হয়ে উঠতে চলেছে।
কারণ সেই মেয়েটা—আরিয়া ব্লুম—শুধু তার হৃদয়ের বরফ গলাবে না… সে এমন এক রহস্যের সাথে জড়িত, যা এই পুরো রাজ্যকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
আর দূরে কোথাও, প্রাসাদের অন্ধকার করিডরে দাঁড়িয়ে সেলিন সবকিছু দেখছিল… তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক হিংস্র হাসি ফুটে উঠছিল।