Jharapata 63 in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | ঝরাপাতা - 63

Featured Books
Categories
Share

ঝরাপাতা - 63

ঝরাপাতা 

পর্ব - ৬৩

🥀🌿🥀🌿🥀🌿🥀

নার্সিং হোমে ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বলেন, মণিকার কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট। অপমান, অসম্মান, মিলিকে যতটা কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে তার দায়ভাগ নিজেরও আছে, এটা ভুলতে না পারা, সবচেয়ে বড় কথা, ভবিষ্যতে কি হবে, এই সমস্ত চিন্তার জালে জড়িয়ে গেছিল মণিকা। জ্ঞান হারানোর আগে মোবাইলে বনির নম্বরটায় আঙ্গুল ছোঁয়াতে পেরেছিল কেবল। বনি জেগে উঠে ফোন রিসিভ করে কোনো সাড়া পায়নি, তবে দুদ্দাড়িয়ে নেমে এসেছিল দুজনেই। 

মাকে দেখেই বিছানার পাশের টেবিলটা থেকে জল নিয়ে চোখেমুখে ছেটাতে শুরু করেছিল বনি। পিউ তখন সব ভুলে দৌড়েছিল রনির কাছে। এই তিনদিন কেউ রনির সঙ্গে কথা বলেনি, তবে মায়ের এই অবস্থায় বনি আর ভাইকে বাধা দেয়নি।

এ্যাম্বুলেন্স ডেকে যখন মণিকাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আশেপাশের বাড়ির লোকেরা টের পেয়েছিল। পুরনো পাড়া, পরস্পরের চেনা, এক দু বাড়ির লোকেরা বেরিয়ে এসেছিল। সমররাও সবাই বেরিয়েছিল আওয়াজ শুনে। এই বিপদ বুঝতে পেরে মিলিও সব ভুলে সামনে এসেছিল, দাঁড়িয়েছিল পিউর গা ঘেঁষে। 

ইতিমধ্যে পাশের বাড়ির ছেলেটি ওদের সঙ্গে নার্সিং হোমে যাবে, তার মা পিউর সঙ্গে থাকবে বলে। ছেলেরা রওনা হয়ে যেতে সমর আর গোপা প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে। পিউকে ছেড়ে যেতে পারছে না এই বিপদের দিনে, অথচ ওদের বাড়িতে যাওয়ার মতো সম্পর্কও নেই। 

পিউই বাঁচিয়ে দিল। সামান্য কথাবার্তার পরই বলল, "কাকিমা, আপনারা ঘরে যান। এই ঠান্ডায় মাঝরাতে বাইরে থাকা ভালো না। বিপাশা কাকিমা আমার সঙ্গে থাকবেন। আমরা দুজনও ঘরে যাচ্ছি।"

গোপা ঢোঁক গিলে বলল, "আমিও থাকব পিউ? তোমার মা সেই সকালের আগে আসতে পারবেন না। যদি তার আগে কোনো দরকার হয়?"

- "আপনারা সবাই তো আছেনই, দরকার হলে ডেকে নেব। এখনই কাকুকে একলা রেখে আসার দরকার নেই। তিনদিন আগে কাকুরও শরীর খারাপ গেল।"

গোপা আর সমরের অস্বস্তি আরও বেড়ে যায় সেদিনের কথায়। মিলিও পিউর মুখের দিকে তাকায়। প্রায় এমনিই পরিস্থিতিতে ও বলেছিল, কোনোদিন এদের বাড়ির কাউকে ডাকবে না। অথচ পিউবৌদির কাছে মা থাকতেও চাইছে, বৌদি কেমন কায়দা করে কাটিয়েও দিল ! 

এদিকে বেচারা বিপাশাদেবী হালের ঝামেলার ঘটনা কিছুই টের পাননি। ওদিকে সাতদিন পর মিলির শ্বশুর বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুষ্ঠান আছে, সেটা শুনেছেন। তাই তিনি নিজের মতো দুঃখ করে বলতে থাকলেন, "কোনো মানে হয়? দুদিন পর এত ভালো একটা কাজ, আজ মণিকাদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেল। এখন তোমরা বলছ, সমরদাও অসুস্থ হয়েছিলেন। এসব কি হচ্ছে? এখন কেমন আছেন দাদা?"

বিপাশার কথায় কাঁটা হয়ে যায় গোপা, পিউ আর মিলি। সমরও কথায় কথা বাড়লে বিপদ হবে বোঝে। তাড়াতাড়ি বলে, "ভালো আছি বৌদি। আপনারা দুজন সাবধানে থাকবেন। আর পিউ মা, কিছু দরকার হলেই ফোন কোরো। গোপা, চলো, ওরাও ঘরে যাক, ঠান্ডা লেগে যাবে।"

সমর আর তার পিছন পিছন বাকি দুজন চটপট ঘরে চলে আসে। 

পিউ ঘরে গিয়ে ছেলেকে দেখে, তারপর শুয়ে থাকে বটে, না পিউর, না বিপাশার, কারও ঘুম আসে না। 

ওদিকে সমর আর গোপা মাথায় এই তিনদিনের দ্বিগুণ চিন্তার বোঝা নিয়ে শুয়ে থাকে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতেও ভয় করে দুজনের। 

মিলি ঘরে গিয়ে হালকা আলোটা জ্বালিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। ও বাড়ির দোতলায় দু ভাইয়ের ঘরেই আলো জ্বলছে। এই তিনটে রাত রনির ঘরের দিকে তাকিয়ে কত কথা যে মেয়েটা ভেবেছে ! 

আজও আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে ওদিকেই তাকিয়ে ছিল। রনি যখন স্বপ্ন দেখে জেগে উঠল, ঘরে আলো জ্বালিয়ে পায়চারি শুরু করল, তখন নিজের কাঁচের জানালায় একটুখানি আলো বাড়ল দেখেই পর্দাটা টেনে দিয়েছিল। 

ওটা রনির, না রনিদার ঘরের আলো, ও জানে। কিন্তু ও যে ঐ জানালাটার দিকেই তাকিয়ে থাকে, সেটা কোনোদিন রনিদাকে জানতে দেবে না। 

অনেক অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। শেষপর্যন্ত রনিদাকে ভরসা করেছিল। অথচ তার এই ফল হল ! তবুও কোথাও যেন সব বিশ্বাস করতে বাধে। সেদিন রনিদা যা করেছিল দিদির বাড়িতে, সেটা মিথ্যে ছিল? কেউ ওরকম একটা কাণ্ড করতে পারে কাউকে সত্যিই ভালো না বাসলে? 

এই ভাবনার মধ্যে এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, এত ঘটনা। এখন ফিরে এসে চেয়ারে বসে দেখছে, পিউবৌদি কোনো ঘরের আলো নেভায়নি। ভুলে গেছে বা একলা আছে বলে নেভাবে না। 

মিলির অদ্ভুত লাগছে রনির ঘরের জোরালো আলোটায়। রনি ঘরে নেই। ও এখন ঐদিকে তাকিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু প্রবলভাবে বুঝতে পারছে, যার উপর রাগ, যাকে আর কখনো ডাকবে না ভেবেছিল, আসলে তাকেই দেখতে ইচ্ছে করছে। তাকে একটা ফোন করলেই জানতে পারত, কাকিমা কেমন আছে। সেই ফোন করাটাই আর কখনো হবে না, এটা ও মানতে পারেনি, বুঝতে পারছে। 

দিদির জন্য, শুধু দিদির জন্য রনিদা....... মিলি সোজা হয়ে বসল, দিদিরা সেদিন ওদের ফাঁকা বাড়িতে রেখে চলে গেছিল। নিজের কাছে মিলি অস্বীকার করতে পারবে না, ওরা দুজন অনেকখানি এগিয়েও গেছিল, পিউবৌদির ফোন না এলে কোথায় থামত, ও নিজে বলতে পারবে না। 

তেমনি দিদি পরে ওকে ফোনে খুব খেপিয়েছিল, বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ওদের মধ্যে কি হয়েছে। মিলি কিছুই হয়নি বলে পাশ কাটিয়েছে। সেকথা বিশ্বাস করে দিদি ওদের দুজনকে বুদ্ধু বলেছে। তিরিশ তারিখ ওবাড়িতে যাচ্ছে শুনে আরও ঠাট্টা করেছে। এমনকি ফুলশয্যা নিয়ে টিপস দিতেও শুরু করেছিল। মিলির কান লাল হয়ে গেছে, দিদিটা খুব হেসেছে। 

তার মানে, দিদি রনিদাকে সত্যিই বন্ধুই ভাবে শুধু। ওকেই রনিদার সঙ্গে দেখতে চায়। রনিদা কি চায়? রনিদার যদি দিদির প্রতিই টান থাকত, দিদির বাড়িতেই ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করতে পারত? কোনোদিন কি ও জানতে পারবে না, রনিদার মনে কি আছে? 

ধীরে ধীরে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে তখন। আর নার্সিং হোম থেকে বনি পিউকে ফোন করে বলছে, "মা এখন ঠিক আছে। তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। মা একবার মিলিকে দেখতে চাইছে।"

চলবে