Jharapata 66 in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | ঝরাপাতা - 66

Featured Books
Categories
Share

ঝরাপাতা - 66

ঝরাপাতা

পর্ব - ৬৬

🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹

মিলিকে দেখেই মণিকার মুখে হাসির আভা ছড়িয়ে পড়ে। নল টল খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন একজন এ্যাটেন্ডেন্ট পাশে বসে ওনাকে ব্রেকফাস্ট করাচ্ছিল, লিকার চা, ডাইজেসটিভ বিস্কুট, ডিমসেদ্ধ আর পাকা কলা। 

মণিকা হাত বাড়িয়ে দিল, "এসেছিস? আয় মা, আমার কাছে আয়।"

মিলি এগিয়ে আসতেই ওর হাত চেপে ধরে, "তুই আর আমাদের ছেড়ে যাবি না। আমার কাছে থাকবি। ঐ ছেলেকে আমি," এ্যাটেন্ডেন্ট মেয়েটি তাকিয়ে আছে খেয়াল হয় মিলির চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে। তাকে মণিকা বলে, "আমার খাওয়া প্রায় হয়েই গেছে, বাকিটুকু খেয়ে নিচ্ছি। তুমি যাও এখন। আমি ওর সঙ্গে কয়েকটা কথা বলব।"

মেয়েটি উঠে পড়ে, "আমি দশ মিনিট ঘুরে আসছি। তবে আপনি বেশি কথা বলবেন না।"

- "আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে বলে নিজের ছেলেকে আদর দিয়ে অমানুষ বানিয়েছি। তার উপর স্নেহে আরও অন্ধ হয়ে ওকে সাপোর্ট করেছি এতকাল।"

- "তুমি এসব কথা ছাড়ো কাকিমা। প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে, তাতে আমার নিজের দিদির অনেক দোষ আছে। তোমার দোষ ধরলে দিদির জন্য আমাদেরও দোষ হয়। সব পুরনো কথা বাদ দাও। তুমি সুস্থ হয়ে যাও এখন, তাহলেই হবে।"

- "তুই বড্ড ভালো মেয়ে। আমার ছেলেটা তোকে পেয়েও তোর দাম বুঝল না। মিলি, তুই আমাকে একটা কথা বল। কেউ জানবে না, রনি দূরে থাক, তোর বাবা মাও জানবে না। তুই কি আর কাউকে ভালোবাসিস? তোর কলেজের যে একটা বন্ধু আছে সে বা আর কেউ?"

মণিকার কথায় আকাশ থেকে পড়ে মিলি। তারপর মাথা নাড়ে, "না কাকিমা, এসব তোমাকে কে কি বলেছে জানি না, পলাশ আমার বন্ধু। ও একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল......"

- "কেউ কিছু বলেনি। এটা তোর আর আমার কথা। কেউ থাকলে তোর ডিভোর্স করিয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার সঙ্গে তোর বিয়ে দিতাম। তোকে সুখী দেখতে চাই আমি। আর কেউ যখন নেই, ঠিক আছে এখন তোর বিয়ের কথা থাক। তবে রনি যতই আমার ছেলে হোক, ওর জন্য তোর আর কোনো ভোগান্তি আমি হতে দেব না। সারাজীবন আমি নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করেছি। এবার তোর পাশে দাঁড়িয়ে সেই লড়াইটাই করব।"

- "তুমি সুস্থ হয়ে যাও কাকিমা। এসব ভেবে ভেবে মনে চাপ নিও না। আমি ঠিক আছি। আগেরবার লোকের কথায় ভয় পেয়েছিলাম। এবার আমি ঠিক আছি।"

- ''তোকে দেখেই আমি অর্ধেক সুস্থ হয়ে গেছি। আর এখন এই যে জোর দিয়ে বললি, ঠিক আছিস, দেখবি, ডাক্তার এলেই বলবে, আমি পুরো সুস্থ।"

- "তাই যেন হয়। তুমি ঠিক হয়ে যাও। পিউবৌদি খুব কাঁদছে। টুকাই মুখটা এতটুকু করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।"

- "তোরও মুখটা ছোট হয়ে আছে, আমি দেখেছি রে। মিলি, কথা দে, তুই হাসিখুশি থাকবি, ওকে পাত্তা দিবি না, ওর জন্য নিজের মনে কষ্ট নিবি না।"

- "আমি ভালো থাকব কাকিমা।" 

- "কথা দে, তুই আমার সঙ্গে থাকবি। ওকে আমি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেব।"

- "কাউকে তাড়াতে হবে না কাকিমা। আমি আছি তোমার সঙ্গে।"

মিলি আর মণিকা বেশ খানিকক্ষণ গল্প করে। ডাক্তারবাবু এ্যাটেন্ডেন্ট মেয়েটিকে বলেছেন, দশ মিনিট নয়, আধঘণ্টা পর যেতে। ওরা ওদের সব কথা বলে নিক। তবে আধঘণ্টার বেশি কথা বলা মণিকার জন্য এখনই ঠিক নয়। 

মিলিকে ডেকে নিয়ে মনিকাকে আবার একবার চেকআপ করা হয়, ইসিজি করে দেখেই ডাক্তার খুশি। মণিকাও বলে ক্লান্ত লাগছে, তবে বুকের ব্যথাটা নেই। 

বাইরে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিল সবাই। মিলিকে ছেঁকে ধরেছিল, কি কথা হয়েছে। রনির প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে, মণিকা ওকে ভালো থাকতে বলেছে, নিজেও ভালো থাকবে বলেছে, এগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছে মিলি। বনি আর পিউর সামনে কি করে বলে, রনির নামে কি কি বলেছে ওর মা? 

ডাক্তার এসে মণিকা ঠিক আছে বলতে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, যাক, মিলি সব সামলে দিল। পাঁচ মিনিটের জন্য পিউকে মণিকার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়, এরপর মণিকাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হবে। 

বনিকে ডেকে ডাক্তার বলেন, "আপনার ভাইয়ের বউ যেন ওবেলাও থাকেন। ওনাকে দরকার, তাহলে আপনার মা তাড়াতাড়ি সেরে উঠবেন আশা করছি।"

পিউ বেরিয়ে এসে বনিকে ফিসফিস করে, "এ্যাই, মামনি কি সব বলছে, মিলিকে সবসময় নিজের কাছে রাখবে, যত্ন করে রাখবে, ভাইকে নাকি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে?"

- "এগুলোই তার মানে মিলিকে বলেছে। ও লজ্জায় আমাদের কাছে চেপে গেছে। সে যাক, আগে মা সুস্থ হোক, তারপর ভাইকে দেখছি।"

বনিকে সবাই বাড়ি ফিরে আসতে বলে। স্নান খাওয়া সেরে বিকেলে আবার আসবে। রনিকে কেউ কিছুই বলে না, সে চুপচাপ ওদের পিছন পিছন ফিরে আসে। 

বাড়ি এসে বনি মামার বাড়িতে ফোন করে মায়ের খবর দেয়। এতদিন চিন্তায় ছিল, মিলিকে বাড়িতে আনার অনুষ্ঠান ক্যানসেল হয়েছে, কিভাবে খবর দেবে। এখন বলে দেয়, মায়ের শরীর খারাপ, কোনো উৎসব অনুষ্ঠান হচ্ছে না। বিকেলে সবাই নার্সিং হোমে আসছে জানায়। 

বড়মামা ধীরেন বনিকে বলে, "তোকে আর যেতে হবে না। সারারাত জেগে আছিস, বিশ্রাম নে। এত লোককে দেখাই করতে দেবে না। সবাই যাচ্ছে, যে পারে দেখা করবে। আশা করি মণি ভালো থাকবে। আমরা দেখে রাখব।"

এদিকে সমর আর গোপাও অমর, শ্যামল, মনোজের বাড়িতে মণিকার অসুস্থতার খবর জানিয়েছে। ওরা চলে আসবে রাতের দিকে। এদের মধ্যে অমরের অবশ্য রনির ঘটনা সবই জানা।

এবেলা তাই সমরের সঙ্গে গোপা, পিউ, মিলি যায় নার্সিং হোমে। রনি আলাদা নিজের বাইকে এসেছে। একটুু আগেই এসেছে দাদা আসবে না বলে। মামারা সরাসরি এসেছে এখানে। কিছুই জানেনা বলে তারা রনির সঙ্গে কথাবার্তা বলে। পিউরা এলেও মামাদের সঙ্গে কথা হয়। পিউ, মিলি, দুই মামা, মণিকার সঙ্গে দেখা করে। 

সব ঠিক আছে, আগামীকাল মণিকাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এবং সে পিউ আর মিলিকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মিলিকে সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে আসবে। দরকার হয়, রনিকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক। 

এদিকে মামারা বেরিয়ে এসে রনিকে বলে, "চা খাব, কোথায় পাওয়া যায় রে?"

রনি বলে, "ভেতরেই পাওয়া যায়। কিন্তু বাগানের ওপারে যেতে হয়। আমি চা নিয়ে আসছি। তোমরা বোসো।"

চায়ের স্টলের একটি ছেলে ফ্লাস্ক আর কাগজের কাপ নিয়ে এসেছে, সবাইকে চা বিস্কুট দিচ্ছে, রনি দেখিয়ে দিচ্ছে, কে কে ওদের লোক। এক এক করে বলতে বলতে এসে দাঁড়ায় পিউর হাত ধরে দাঁড়ানো মিলির মুখোমুখি। 

চলবে