Jharapata 86 in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | ঝরাপাতা - 86

Featured Books
Categories
Share

ঝরাপাতা - 86

ঝরাপাতা 

পর্ব - ৮৬

🌹💞🌹💞🌹💞🌹

রনি পিউর কাছে শুনেছিল মিলি বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছে। ভেবেছিল, ভালোই হয়েছে। বেচারা ঘরে আটকে পড়ে আছে। এমনকি ঘরেও এখনও ওর নিজের জায়গাটা ফিরে পায়নি মেয়েটা। যতক্ষণ বাইরে থাকে, সব ভুলে থাকবে। এভাবেই এই দুটো দিন পার হয়ে যাক মেয়েটার জীবনে। তার সঙ্গে সঙ্গে বারবার আশা করছিল, একবার মেসেজ করে হলেও ওকে বলবে মিলি, বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছে। 

কোথায় কী ! বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল আর খুব মনখারাপ হয়ে যাচ্ছিল রনির। এখনও মিলির এতটুকু কাছের মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি? নিজের ছোট ছোট আনন্দগুলো ওর সঙ্গে শেয়ার করতে ইচ্ছে করে না মিলির? নিশ্চয়ই ভাবছে, ও সেই প্রথম দিনের মতো রাগ করবে, সিনেমায় যেতে দেবে না? 

ততক্ষণে সবাই আলোচনা করছে, জোরদার ঝড়বৃষ্টি আসছে। শুনেই রনির মনে পড়ল, মিলির একেবারে ডিনার সেরে ফেরার কথা ! মলের ভিতরে বন্ধুদের সঙ্গে মজে আছে, রনির কথা, বাড়ির কথা মনেই নেই। ঝড়ের খবরও নিশ্চয়ই পাবে না। ফোন করতে গিয়েও থেমে যায় রনি। কী না কী ভাববে, যদি রেগে যায়, মনখারাপ করে? বাড়ির কেউ আর ওদের ঝামেলা হলে সহ্য করবে না। 

একেবারে চলেই যাবে ছুটির পর, ফোন করে ডেকে নেবে। যদি দেখা যায়, এদিকে ঝড়বৃষ্টি নেই, আরেকটু অপেক্ষা করবে। নাহলে সঙ্গে করে নিয়েই আসবে। 

রাস্তায় বেরিয়ে রনি দেখল, ক্রমশঃ মেঘ জড়ো হচ্ছে। সন্ধের মুখে মুখে এই সময়ে পশ্চিম আকাশে লাল কমলা দিনশেষের আলো ছড়িয়ে থাকে। আরও পরে ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বালানো হয়। আজ অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশ অন্ধকার, যেন ঘড়ির কাঁটাকে ছাড়িয়ে একঘন্টা এগিয়ে গেছে সময়। 

শপিং মলের সামনে সরাসরি যাওয়া যাবে না। আর ওখানে ছাড়া পার্কিং নেই, রনি জানে। রাস্তার বাঁদিক দিয়ে ওকে এগিয়ে যেতে হবে প্রায় দুশো মিটার। ডিভাইডার থেকে বাইক ঘুরিয়ে ফিরে এসে আগে পার্ক করতে হবে, তারপর ফোন। 

শপিং মলের কাছাকাছি এসে একবার ঘাড় না ঘুরিয়ে পারল না ও, ঐ বিশাল বাড়িটার ভিতর মিলি আছে। আপনা থেকেই বাইকের স্পীড কমে গেছিল, সঙ্গে সঙ্গে অবাক হয়ে গেল, শপিং মলের আগেই একটা বড় পাঁচিল ঘেরা কমপ্লেক্স, ভিতরে একটা বড় রেসিডেন্সিয়াল প্রোজেক্টের কাজ চলছে, সেই পাঁচিলের পাশে মিলি দাঁড়িয়ে, সঙ্গে একটিই ছেলে। 

কিছুই মানে বোঝে না রনি, তবে মিলিকে চিনতে ওর ভুল হতেই পারে না। গত কয়েক মাস ধরে সপ্তাহে পাঁচ ছদিন ও মিলিকে ছুটির পর আনতে যায়। কলেজের গেটের জটলা পার হয়ে মিলি একপাশে ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকে। রনি ঠিক দেখতে পায়, ও কোনদিকে আছে। তাই ওটা মিলি‍ই ছিল। কিন্তু ও বাইরে কেন? সঙ্গে কে? 

ডিভাইডারের ক্রসিং এ সিগন্যাল খুলছে না। রনি টেনশনে আঙ্গুল মটকাচ্ছে, বুক ঢিপঢিপ করছে। মিলি কার সঙ্গে এসেছে? সব বন্ধু আসেনি? একলা এসেছে? কোনো গোলমাল আছে বলেই কি ওকে বলেনি? রাস্তাটা আলোয় ধুইয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ চমকায়, কান ফাটানো আওয়াজটা তার পরেই। 

রনি চোখ বুজে ফেলে, মিলি বাইরে খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। যত তাড়াতাড়ি ওর কাছে পৌঁছনো যায় ! কিন্তু সমস্যা আছে। এখন মিলির সামনে গেলে যদি মনে করে ও নজর রাখছে? কোনোভাবেই মিলিকে চটাতে চায় না রনি। অনেক গোলমাল হয়েছে। আর দুটো দিন পার হলে ও বাঁচে। একবার মিলিকে বরণ করে ঘরে আনতে পারলে, মিলি যত পারে ঝগড়া করুক, রনি চুপ করে সব শুনবে। 

সিগন্যাল খোলা পেয়ে বাইক ঘোরাতে ঘোরাতে হেসে ফেলল রনি, পুঁচকে একটা মেয়ে, রনি একবার চোখ পাকালে কেঁদে ফেলে, তাকে আজকাল এত ভয় পায় রনি, ভাবা যায় ! আসলে ভয় পাই না, ওকে কেয়ার করি, নিজের মনে বলতে বলতে খুব ধীরে ধীরে এগোনোর সঙ্গে রাস্তার ধারে তাকিয়ে মিলিকে খুঁজতে থাকে ও। শপিং মল পেরিয়ে, আগের পাঁচিলটার ধারে পলাশ দাঁড়িয়ে আছে। আর পাঁচিলের শেষের দিকে, বাসস্ট্যান্ডে মিলি দাঁড়িয়ে। বাসস্ট্যান্ডের শেডের নিচে চেয়ার গুলো খালি। কিন্তু মিলি ভিতরে যায়নি, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। তার মানে ও বাস ধরবে, ফিরে যাচ্ছে। পলাশ বাসে তুলতে এসেছে হয়ত। রনি নিশ্চিন্তে ওর পাশে বাইক থামায়। 

মিলির চোখ রাস্তার দিকে, তাছাড়া রনির এখন এখানে আসার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। ও বাইকের দিকেও তাকায় না। রনি একবার বাইকের হর্নটা বাজিয়ে দেখে, নো রেসপন্স। ততক্ষণে ওর মুখে ঠোঁট টেপা মুচকি হাসিটা ফিরে এসেছে। বাইকটা একদম মিলির গায়ের কাছে লাগিয়ে হেলমেট খুলতে যায়। 

মিলি এমনিতেই ভয়ে কাঁপছিল। রনি জানে না, ও পলাশের সঙ্গে সিনেমায় এসেছে। ইচ্ছে করেই বলেনি। আর হাঙ্গামা ভালো লাগে না। বাড়ির বড়রা সব জানে, ওরাই ঠেলে পাঠিয়েছে। বন্ধুদের সব্বাই এসেছে। ফিরে গিয়ে বলবে, সবার সঙ্গে সিনেমায় গেছিল, তাও পরীক্ষার পর। বাড়ির সবার সামনে রনি কিছু বলতে পারবে না। 

সেই প্ল্যান এখন ওর গলার ফাঁস হয়ে গেছে। পলাশ যা করল, এরপর না মিলি বন্ধুদের কিছু বলতে পারবে, না পলাশের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে পারবে। আর যদি রনি টের পায় এই ব্যাপারে, তখন পলাশের কথা লুকোবে কী করে? তার সঙ্গে আকাশ দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি জোরে বৃষ্টি নামবে। বাস না পেলে কী হবে? 

প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে মিলির, "আমার সঙ্গেই এরকম হয় কেন? আমার বিয়েটাই এরকম করে হল কেন? রনিকে কিচ্ছু বলতে পারব না কেন? আমার কোনো দোষ নেই, বুঝবেই না।"

হঠাৎ একটা বাইক গায়ের উপর এসে দাঁড়াতে আরও ভয় পেয়ে যায়। ফাঁকা রাস্তায় কত রকম অসভ্যতা হয়, কে না জানে? ছিটকে সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক কৌতূহলে একবার বাইকের দিকে না তাকিয়েও পারে না। 

রনির হাসিমুখটা দেখামাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর হাত আঁকড়ে ধরে, "তুমি? তুমি কোত্থেকে এলে?"

মিলিকে দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কী প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। রনি ওর পিঠে হাত রেখে সাহস দিয়ে বলে, "ভয় পেয়েছ? পাগলী কোথাকার। বৃষ্টি আসছে, আমাকে ফোন করবে তো। যাকগে, আমি এসে গেছি, আর ভয় পায় না। চলো, বাইকে ওঠো।" মিলির হেলমেটটা এগিয়ে দেওয়ার আগেই আবার বিদ্যুৎ চমকায়। মিলি ভয়ে ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে। 

বাজের আওয়াজটা কমে যাওয়া পর্যন্ত রনি ওর পিঠ আঁকড়ে ধরে রাখে। তারপর হাত সরিয়ে আস্তে আস্তে বলে, "মিলি, ছাড়ো, এটা রাস্তা। ভয় পাচ্ছ কেন? আমি এসে গেছি তো। চলো, বৃষ্টি নামার আগে ফিরতে হবে।"

মিলি মুখ তুলে তাকাতেই রনির চোখে আশ্বাস দেখে। রনি ওর কাঁধে এক হাত রেখে অন্য হাতে হেলমেটটা এগিয়ে দেয়, "চটপট, চলো। বৃষ্টি আসছে।"

এবার মিলি হেলমেটটা নেয়। শখ করে শাড়ি পরে এসেছিল। এখন তার জন্য আরও বিরক্ত লাগছে। শাড়ি সামলে বাইকে উঠে বসে। 

সমস্ত দৃশ্যটাই তীব্র বিদ্বেষ নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে পলাশ। অদ্রিজা বলেছে, ও রনির বাড়িতে আছে। তার মানে সব ঠিক হয়ে গেছে। অথচ ও জানতেই পারেনি।

এখন চোখের সামনে দেখল, রনি ঠিক জানে, অদ্রিজা কোথায়। বাজের আওয়াজে ভয় পাচ্ছে বলে কত যত্ন করে আগলে রেখেছিল অদ্রিজাকে। বিরাট ভুল করেছে ও। নিজের মনের কথা অদ্রিজাকে বলে বিরাট ভুল করে ফেলেছে। আপশোষে মাথা নাড়ে পলাশ। 

ফোনটা বাজতে কানে দিয়ে বলে, "তোরা ফুড জোনে বস। অর্ডার দে, আমি আসছি। ওও হ্যাঁ, অদ্রিজা চলে গেছে। ওর বর এসে নিয়ে গেছে।"

চলবে