ঝরাপাতা
পর্ব - ৭০
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
বনিকে ভয়ে ভয়ে রনি বলে, "আমার উপর রাগ করে আছিস, জানি। সেটা নিয়ে কিছু বলছি না। একটা রিকোয়েস্ট করছি, আমার লাস্ট রিকোয়েস্ট ধর, লিলি তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়। প্লিজ, পাঁচটা মিনিট শোন, ও কি বলছে?"
বনি পড়ে যায় আরকি ! ও ভাবতেই পারেনি, রনির এই সাহসটা হবে, এতকাণ্ডের পর ওকেই লিলির সঙ্গে কথা বলতে বলবে। ভয়ঙ্কর রাগ হলেও ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। কোনো অপরাধবোধের ছাপ নেই সেখানে। এতটাই নির্লজ্জ, বিবেকহীন ছিল না রনি। বরং সবার ভালো চাইত বরাবর।
আর একথা ভাবতেই বনির অন্য কথা মনে হয়। লিলি কোনো বিপদে পড়েনি তো? আটমাস হল, মেয়েটা বাড়িছাড়া। কোথায় আছে, কি করছে? ওদের আত্মীয়রাও বলছে, ওর খবর নেওয়া উচিত। নাহ, এখন ভাইকে ধমকানোর বা নিজের রাগ দেখানোর সময় নয়।
বনি ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখে, "বেশ, কথা বলব। তার আগে তুই বল......."
- "আমি কিছু বলব না দাদা। আমার বলার বাইরে চলে গেছে সবটা। মা এতটা অসুস্থ হয়ে গেছে, আমার আর মুখ নেই কিছু বলার। এখনও, আমি না, লিলিই তোদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। সত্যি কথা বলতে, মিলি বা বৌদির সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। ওরা আমার সঙ্গে কথা বলবে না। তাই তোকে একবার রিকোয়েস্ট করলাম। তুই রাজি হলি বলে আমি তোর কাছে সারাজীবন গ্রেটফুল থাকব।" রনি ফোন করছে।
বনি মনে মনে বলে, "নিকুচি করেছে তোর গ্রেটফুলের। আমার এদিকে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, লিলির কি হয়েছে ভেবে। কি শুনব কে জানে? খারাপ কিছু শোনার পর একটা মেয়েকে হেল্প না করেই বা থাকব কি করে?"
রনি তখন ফোনে বলছে, "লিলি? দাদা এসেছে। এখানে কেউ নেই। তোমার কিছু বলার থাকলে দাদাকে বলতে পারো।" ফোনটা বনির হাতে দিয়ে ও চুপচাপ খাটের ধারে বসে পড়ে। ফোন কানে হ্যালো বলে বনিও ভাইয়ের পাশেই বসে পড়ে।
- "বনিদা, আমার মানে আমি সরি। আমিই সব গোলমাল পাকিয়েছি। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। কিন্তু রনিদার উপর রাগ কোরোনা তোমরা।"
- "কি গোলমাল হয়েছে লিলি?" বনির ভয়ে পেট গুড়গুড় করছে।
- "গোলমাল যা হয়েছে, সে কে না জানে? তোমাদের সবাইকে তখন লোকের সামনে ছোট হতে হল। মিলির হঠাৎ বিয়ে দিতে হল।"
- "ওসব পুরনো কথা ছাড়ো লিলি। এখন কি হয়েছে?" বনি ওকে থামায়।
- "এখন আলাদা কিছু হয়নি বনিদা। আসলে রনিদার সঙ্গে আমাদের দেখা হওয়ার পর থেকে ও তো আমাদের অনেক হেল্প করেছে," এই অবধি শুনে বনি কটমট করে ভাইয়ের দিকে তাকায়। সে নিজের হাতের তালুর দিকে চেয়ে আছে।
লিলি বলে যাচ্ছে, "আমার মানে আমার যে শ্বশুর বাড়ি, আমার হাজব্যান্ড যুগলের আসল বাড়িতে কেউ তো এই জাতের বাইরে বিয়ে মানেনি। ওরা যুগলকে বারবার ফিরে যেতে বলেছে। রনিদা পুরো সময়টা যুগলের পাশে ছিল। ও না থাকলে আমিও বোধহয় জানতে পারতাম না, যুগল কতটা ভালোমানুষ।"
বনি এবার প্রচ্ছন্ন গর্ব নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। স্পীকারে দিয়ে কথা বলছে বনি, রনি সব শুনছে। তবে বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কোনো বদল নেই।
- "ঠিক আছে ঠিক আছে লিলি। তুই ভালো থাক। আমরাও সেটাই চাই।" বনির মনের ভার অনেকটা কমেছে।
- "আমি ভালো আছি বনিদা। যুগল কি করেছে জানো না। ও আর কোনোদিন যাতে ওর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকে, ওরা যাতে আমাদের দুজনকে আলাদা করতে না পারে, তাই ওদের ফ্যামিলির......"
- "লিলি, এসব ছাড়ো। রনি যে আমাদের দুজনকেই খুব ভালোবাসে ওর মনটা বড় বলে, তাই বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়, ওটা বলো। রনি আর মিলিকে আমরাও খুব ভালোবাসি। ওদের বলো, রনিকে মাপ করে দিতে, মিলিকে একটু বোঝাতে বলো, আমার সঙ্গে যাতে কথা বলে মিলি। তোমার গল্পে উনি বোর হয়ে যাচ্ছেন।" লিলিকে থামিয়ে যুগল বলে ওঠে। ওর গলা না চিনলেও বনি বোঝে, এই লিলির হাজব্যান্ড।
- "তুমি কাউকে বলতে চাও না। কিন্তু ওদের জানা দরকার, তুমি কিভাবে তোমার সবকিছু ছেড়ে দিয়েছ। যার জন্য রনিদা চায় অন্ততঃ আমার বাড়ির লোকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ তৈরি হোক। তার জন্যই ওকে সবাই ভুল বুঝছে যে।" লিলি ওর বরকে বলছে, তবে সব কথাই এরা দুভাই শুনতে পাচ্ছে।
রনি উঠে ঘরে পায়চারি করছে। বনি ফোনে বলে, "আমি একটুও বোর হচ্ছি না। বরং আমার মনে হচ্ছে তুই অনেক বড় একটা অন্যায় করেছিস, আজ পর্যন্ত সব কথা আমাদের সবাইকে লুকিয়ে। আজ আমি সব শুনতে চাই লিলি। সব বল। তোর হাজব্যান্ডকে বল, আমি নিজেই সব শুনতে চাইছি। আচ্ছা, একমিনিট দাঁড়া, আমার মনে হয় কথাগুলো সবার শোনা দরকার। আমি তোর বৌদির কাছে ফোনটা নিয়ে যাচ্ছি। রনি, ফোনটা তোকে পরে ফেরত দিচ্ছি।" বনি নিচের তলায় হাঁটা দেয়।
রনিও উঠে পড়ে বলে, "তাড়া নেই, তোরা কথা বল। আমি আধঘণ্টা ক্লাব থেকে ঘুরে আসছি।"
রনি বেরিয়ে যায় আর বনি ফোন নিয়ে সবার মাঝখানে বসে। রনির সঙ্গে দেখা হওয়ার দিন থেকে সব কথাই একে একে খুলে বলে লিলি আর যুগল। বিয়ের আগে কথা লুকোনোর জন্য সবাই ওদের বকুনি দেয়। শেষে ভিডিও কল করে যুগলকে দেখে এরা, আলাপ করে। ওদের সব কথা ওদের বাবা মাকে বলবে, বাড়িতে নিয়ে আসবে, তার আগে রনি আর মিলির ঝামেলা মিটিয়ে দেবে দায়িত্ব নেয় বনি আর পিউ। মিলি একরাশ আশা বুকে নিয়ে সবার হাসিঠাট্টা, ঠেলাঠেলিতে মাঝে মাঝে লাজুক হাসি দেয়।
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
রনি জানে না, মিলির মামা মেসোদের কথায় শুরু হয়ে সবটাই পজিটিভ দিকে যাচ্ছে। তাই বাড়ি ফিরে দেখে, বেশ গল্প হচ্ছে। পিউ ওর মাকে খেতে দিচ্ছে। মা অবশ্য মিলি আর টুকাইকে দুপাশে নিয়ে খেতে বসেছে, নাহলে খাবে না। মিলি টুকাইকে খাইয়ে দিচ্ছে বলে পিউ মামা মামীদের বসে পড়তে বলছে। আর তারা সবাই মনিকাকে বোঝাচ্ছে, মিলি একেবারে সোনার টুকরো মেয়ে, হীরের মতো মন।
রনি মনে মনে বলে, "একেবারে প্ল্যাটিনামের মতো শক্ত মন, স্ক্র্যাচপ্রুফ। কারও জন্য, বিশেষ করে আমার জন্য সেখানে একটা আঁচড়ও পড়ে না। আজ জানুয়ারির পঁচিশ। আর কদিন পরই ভ্যালেন্টাইন সপ্তাহ। ও মেয়েকে সিন্দুকে রাখা উচিত। নাহলে গলিয়ে গয়না বানিয়ে ফেলবে জুয়েলাররা। হীরে বসানো প্ল্যাটিনামের গয়নার বিপুল চাহিদা থাকে কিনা তখন।"
রাগে মটমট করে এসব ব্যঙ্গাত্মক কথা ভাবতে ভাবতেই মুষড়ে পড়ে, কত ভেবে রেখেছিল, মিলিকে নিয়ে এবার ভ্যালেন্টাইন উইকের সব কটাদিন সেলিব্রেট করবে। গোলাপ, চকলেট, টেডিবেয়ার সব কিনে দেবে, সব।
লিলির জন্য একটা সোনার আংটি কেনা হয়েছিল, দাদাবৌদিসহ গিয়ে কিনেছিল। সেটা ও ফুলশয্যায় মিলিকে দেবে না কিছুতেই। বরং একটা প্ল্যাটিনামের হীরের আংটির সেট কিনবে ভেবেছিল মিলিকে নিয়ে গিয়ে। ডিজাইনটা মিলি বেছে দেবে। আর দুজনেই একই ডিজাইনের আংটি পরবে এই প্রথম ভালোবাসার দিনটার কথা মনে রেখে।
এদিকে ছোটমামী ওকে ফিরতে দেখে বলে, "এই তো রনিও এসে গেছে। ওদের দুই ভাইকে আমি খেতে দিয়ে দিচ্ছি। পিউ, তুই, আমি আর বড়দি একসঙ্গে বসে যাব।"
রনি ঢুকেছে শুনেই মিলি যে কলকল করে টুকাইকে গল্প বলছিল, সেটা বন্ধ। আসলে তো বেচারা শ্বশুর বাড়ির ছোট বড় সবার সামনে লজ্জায় পড়ে গেছে এতক্ষণের আলোচনায়। লিলির ফোনের পর মণিকাকেও সব বলা হয়েছে রনি ফেরার আগে।
রনি মনে মনে বলে, "হ্যাঁ চুপ করে থাকো আমার নাম শুনলেও। ঐ ঢ্যাঁড়সের তরকারি দিয়ে রুটিই খাও। ওটাই তোমার ঠিক। ভ্যালেন্টাইন উইকের গিফট, বেড়ানো, সিনেমা, ডিনার, তোমার ওগুলো ভালো লাগবে না আমার সঙ্গে।"
গম্ভীর হয়ে মামীকে বলে, "আমার খাবারটা প্লেটে দিয়ে দাও। একটা ইমপর্টেন্ট নোট বানাচ্ছি। দুদিন পড়া হয়নি। আজ পড়তে পড়তে আমার ঘরে খেয়ে নেব।'
অনেক কষ্টে সবাই হাসি চেপে থাকে। আজ রাতে আর কথা বাড়িয়ে কাজ নেই। মণিকার বিশ্রাম দরকার। তাছাড়া মিলিকে একটু কায়দা করে সরিয়ে প্ল্যান করা হয়ে গেছে, কাল দুজনকে একলা কথা বলতে দেওয়া হবে।
শুধু রনি খাবার নিয়ে চলে যেতে বড়মামা বলে, "তোরা আর লেগপুল করিস না বেশি। এখানে বসে খেলোও না।"
চকিতে একটা দৃষ্টি বিনিময় হয় বনি, পিউ আর মিলির। ক্লাব থেকে এসে সবার সঙ্গে টেবিলে বসল না কেন? ও তো জানে না, সবার রাগ পড়ে গেছে। আবার ড্রি *ঙ্ক করা শুরু হল?
মিলির মুখচোখে উদ্বেগটা পড়তে পিউর অসুবিধা হয় না। ফিসফিস করে বলে, "আজ খেয়েদেয়ে, যেমন প্ল্যান হয়েছে, আমরা মেয়েরা একঘরে শুয়ে পড়ি চল। কাল সকালে সবাই বেরিয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। তারপর ওর সঙ্গে কথা বল। সব ঠিক হয়ে যাবে। খানিকটা নিজেই জানতিস বললি, বাকিটা লিলির কাছে শুনলি তো আজ। ভাই কোনো অন্যায় করেনি। সব মিলিয়ে গোলমাল পেকে গেছে। কাল সব ঠিক হয়ে যাবে।"
চলবে