ঝরাপাতা
পর্ব - ৬৪
🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹
- "মামনি একদম ঠিক হয়ে গেছে?" পিউ প্রশ্ন করে।
- "একদম ঠিক হয়ে গেছে তা নয়। তবে জ্ঞান তো এসেছে অনেকক্ষণ। এখন অক্সিজেনও দিতে হচ্ছে না। বুকের ব্যথাটা আছে। নিজেই ডাক্তারের কাছে বলেছে। তবে ওটাও কমে যাবে বলছে ডাক্তাররা। আমিও কথা বললাম। কোনো ভয় নেই বলল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মা মিলিকে দেখতে চাইছে।" বনি ঘটনাটা খুলে বলে।
- "মিলিকে কি করে..........তোমার ভাইকে বলো গিয়ে।" পিউ চটে ওঠে।
- "থাক, মাথা ঠান্ডা করো এখন। চুপ করে বসে আছে। এ্যাম্বুলেন্সে মার হাত ধরে বসে ছিল। জ্ঞান আসার পর থেকে মা তো ওর নামও করছে না, খালি আমাকে ডেকেছিল। আমাকে বলছে" বনির গলাটা ধরে যায়, গলা খাঁকড়ে নাক টেনে বলে, "আমাকে ধরেছে, মিলির সঙ্গে একবার দেখা করা। বলছে, যদি মরে যাই, কি বলব বলো?"
- "আমি তো বুঝতে পারছি, ঐ চিন্তাতেই মামনির......। তোমার ভাই বোঝে? একটা কাণ্ড পাকালো। আচ্ছা, মিলির সঙ্গে ওর কি কথা হয়েছে?"
- "পরেরদিন দেখা করেছিল, আমি শিওর। কি কথা হয়েছে, কে জানে? আর এই লিলির ব্যাপারটাও বুঝতে পারছি না। লিলি কেন ওর সঙ্গে যোগাযোগ করল?"
- "দেখো গিয়ে যে ছেলের সঙ্গে পালিয়েছিল সে ফালতু। এখন ভাইটাকে পেয়েছে, এটারও বুদ্ধি নেই, ওর ঘাড়ে চাপতে চাইছে। আরে তুই কি বাচ্চা ছেলে? যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, বিয়ে করেছিস। বউটার হাঁড়ির হাল করেছিস একবার। তুমিই ঠিক ছিলে, ওকে একদম মিলির ধারেপারে যেতে দেওয়া উচিত হয়নি। ডিভোর্স হয়ে যেত, লিলিকে নিয়ে যা খুশি করত। এখন কি কেলেঙ্কারিটাই হল ! আমি বাড়িতে মাকেও বলিনি, বলা যায় এই কীর্তি?" পিউ রাগ, দুশ্চিন্তা সব উগরে দেয়।
- "ছাড়ো এখন। শোনো না। একবার দেখো না, মায়ের জন্য। আমি বুঝতে পারছি, তুমি সবচেয়ে কষ্ট পাও মিলির সঙ্গে যা হচ্ছে তাতে। এই অবস্থায় ওকে আবার ডাকা ! এই শেষবার, পিউ, আমি বলছি বলে একটু যাও না। আমিই যেতাম। এখানেও কাউকে থাকতে হবে। মার কি রকম কি অবস্থা হয় ! আর যা বুঝতে পারছি, মিলির সঙ্গে দেখা না করালে মা রিকভার করতে পারবে না।" বনি কাচুমাচু হয়ে বলে।
- "সেটা আমি বুঝেছি। দেখছি কথা বলে, মিলিকে আনা যায় কিনা। অন্ততঃ কাকিমাও যদি আসেন। মামনির ভালো লাগবে একটু।"
- "তুমি এটা কি করতে পারো দেখো পিউ। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে......."
- "কি হচ্ছে কি? এগুলো কি বকছ? তোমার দিকে তাকিয়ে মানে? মামনির শরীর খারাপ, আমাকে তুমি তোমার আমার শোনাচ্ছ তখন থেকে?"
- "তোমাকে শোনাচ্ছি না। তুমি মামনিকে কতটা ভালোবাসো বা মামনি তোমাকে, সেসব আমি জানি। আমি মানে আমি বলতে চাইছি মিলির ব্যাপারে। মিলিকে ডাকা আমার নিজেরই পছন্দ না। কোনোদিন মেয়েটার জন্য আমরা ভালো কিছু করলাম না, আজ দরকার পড়েছে বলে ওর দরজায় গিয়ে দাঁড়ানো, ভালো লাগছে না পিউ।"
- "তুমি চিন্তা কোরো না, একটা ব্যবস্থা হবে। আমরা নাহয় একটু নিচু হলাম। মায়ের জন্যই তো। আমি তোমাকে ফোন করে বলছি, কি করতে পারি। চেষ্টা করব, মিলিকে নিয়েই যাওয়ার। রাখছি তাহলে?"
- ''দাঁড়াও দাঁড়াও, টুকাই কি করছে? ওকে কি করবে?"
- "টুকাই উঠবে এবার। ওকে তৈরি করে রাখছি। মা এখানে এসে যাবে। আমি তো মা এলেই বেরিয়ে যেতাম। এখন দেখি মিলির কি করা যায়। তুমি চিন্তা কোরো না। মা আবার ডাকলে বোলো, আমি ওদের নিয়ে আসছি। রাখলাম এবার।"
🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹
ইতিমধ্যে বিদিশা কাকিমার স্বামী এসেছিলেন ওদের খোঁজ নিতে। তাদের ছেলে ফোন করেছে, মণিকা অনেকটা ভালো, বনি তাকে বাড়ি চলে আসতে বলেছে।
পিউ বলে বনি ওকেও ফোন করেছে। রাতের সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে, ঐ কাকু কাকিমাকে চা খাইয়ে বাড়ি পাঠায় পিউ। ভয়ে ভয়ে এবার টুকাইকে নিয়েই মিলিদের বাড়িতে হানা দেয়।
ওরাও সকাল সকাল উঠে পড়েছে। সমর আর গোপার মাথায় ঘুরছে, মণিকা রাতে ভর্তি ছিল, আজও যদি না ছাড়ে, ওদের কি একবার দেখতে যাওয়া উচিত? কারণ ইতিমধ্যেই পাড়ার একটা পরিবার স্রেফ প্রতিবেশী হিসেবেই ওদের পাশে দাঁড়িয়েছে। গোপার সঙ্গে যেমন পাড়ায় অনেকের ভাব, মণিকার সঙ্গেও। দুই ছেলেও ক্লাবে আড্ডা দেয়, বন্ধুবান্ধবে পাড়া ভর্তি। এরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নার্সিং হোমে যাবে, ওরা না গেলেই হাজার কথা শুরু করবে।
যা ঘটে গেছে তারপর বিয়েটা ভেঙে দিলেও, এখনই সবটা প্রচার করা কতটা উচিত হবে, সেটাই ভাবছে সমর আর গোপা। কারণ আগেরবার বহুজনের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে, মিলির উপর সাংঘাতিক খারাপ একটা প্রভাব পড়েছে। এবার যতদিন পারা যায়, কথাটা চেপে রাখতে হবে, ঠিক করে ওরা।
তখনই পিউ হাজির। গোপা সত্যিই মন থেকে ডেকে নেয় ওকে, টুকাইকে যত্ন করে বসিয়ে বিস্কুট খেতে দেয়, মণিকার খবর নেয়। বনিকে সাহস দিয়েছিল পিউ, এবার নিজেই ভেঙে পড়ে। চোখের জল মুছতে মুছতে বলে, "মামনির একটা এ্যাটাক হয়ে গেছে, জ্ঞান ফিরেছে, কিন্তু বুকে ব্যথা। কি হবে সব এখনও জানিনা। ওদিকে রনির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। বরং মিলিকে দেখতে চাইছে, ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।"
চোখাচোখি করে সমর আর গোপা, নিজেরা তো যাবেই, মিলিকেও বোঝাবে, একবার অন্ততঃ মিলির যাওয়া উচিত। ভদ্রতা কাকে বলে, সেটা রনিকে দেখাতেই যাওয়া উচিত।
চলবে