Jharapata 67 in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | ঝরাপাতা - 67

Featured Books
Categories
Share

ঝরাপাতা - 67

ঝরাপাতা 

পর্ব - ৬৭

🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹

মিলিকে সামনে দেখে রনি প্রথমে মাথা নিচু করে ফেলে। তারপরই মনে পড়ে মামারা রয়েছে, ওরা কিছু জানেনা। ছেলেটিকে আস্তে আস্তে বলে, "ওদের দুজনকে চা দাও, আর আমাকেও দিও।"

মিলির থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়ানোর আগেই শোনে মিলি বলছে, "আমি চা খাব না।"

রাগটা আবার ফিরে আসে রনির, মনে মনে বলে, "খেও না চা, কিছুই কোরো না। সারাজীবন বসে বসে ভাবো, আমি খারাপ, আমার চরিত্র খারাপ। আমি চা কিনেছি, তাই ওটাও খারাপ।" 

খানিকটা দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলেটি ফিরে এলে তাকে টাকা দিয়ে নিজের চা টা হাতে নিয়ে চুমুক দেয়। মামারা এসে ওর দুপাশে দাঁড়িয়েছে, তিনজন টুকটাক কথা হচ্ছে। 

পিউ আর মিলি দুজনেই ওদিকে টেনশনে একাকার হচ্ছে, এবার কি হবে? কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছে না লোকজনের মাঝখানে। কোনোমতে চা শেষ করেই পিউ বলে, "চলো সবাই বাড়ি যাই, বনিকে সব খবর বলি।"

বাড়ি ফিরেই পিউ সবার সামনেই বনিকে বলে মণিকা কি আবদার ধরেছে। এই টেনশন ও আর একা একা চেপে থাকতে পারছিল না। 

বড়মামী কেকা বলে, "দুদিন পরেই মিলিকে এ বাড়িতে আনা হত। তা এখনই আসুক। মণি যদি তাতে ভালো থাকে, সেটাই তো ভালো।"

বড়মামীর কথার সূত্র ধরে বনিকে বলতেই হয়, মিলিদের বাড়িতে রনি কি করে এসেছে, "আসলে একটা গণ্ডগোল হয়েছে মামী। রনি সেদিন ওদের বাড়িতে নিমন্ত্রিতদের লিস্ট দেখতে দেখতে বলে ফেলেছে, লিলিকেও নেমন্তন্ন করতে, ওকে মেনে নিতে। কাকু কাকিমা কেউ রাজি না। তাতেও ও থামেনি, ভালোই তর্কাতর্কি করে ফেলেছে।"

- "বলিস কি !" বড়মামা চোখ কপালে তোলে। 

রনি ওদের একটু আগেই ঢুকেছিল। এসব কথা শুরু হতেই উঠে পড়েছিল। বড়মামা বলল, "এখানে বোস রনি। বুঝতেই পারছি, অনেক গণ্ডগোল হয়ে গেছে।"

- "গণ্ডগোল বলে গণ্ডগোল ! কাকু চেঁচামেচি করে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ভাগ্যিস অল্পে সামলে গেছে, মায়ের মতো হয়নি। আর ইয়ে হয়েছে, মানে কাকু বলে দিয়েছে, মিলিকে আমাদের বাড়িতে পাঠাবে না। কাকুর অবস্থা দেখে মিলিও খুব রেগে গেছিল। তাই মিলিও বলে দিয়েছে, আর রনির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না।"

- "বাহ, এতকিছু হয়ে গেছে, আমাদের একবার বলিসনি পর্যন্ত?" ছোটমামা অভিযোগ করে। 

- "বলতাম মামু। আমরা ওদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম। মামনি এত টেনশন করছিল দেখে তোমাদের টেনশনে ফেলতে চাইনি। আমিই গেছিলাম পরশু। মিলির রাগ পড়েনি। তারপর কাল রাতে মামনির শরীর খারাপ হতে কথাবার্তা শুরু হল। সকালে মামনি মিলিকে দেখতে চেয়েছে শুনেই অবশ্য সবাই গেল, দুবার বলতে হয়নি।" পিউ ছোট করে বলে। 

- "এখন তাহলে অনেকটা মিটেছে বল?" বড়মামা বলে। পিউর কাছে আজকের ঘটনা শুনে সবাই একটু সাহস পেয়েছে। 

- "মিটেছে কি আর? মিলিকে কি ওরা পাঠাবে নাকি? এদিকে মায়ের আবার না শরীর খারাপ হয় মিলি না এলে !" বনি আক্ষেপ করে। রনি চুপ। 

- "সমরদার সঙ্গে তর্ক করা রনির উচিত হয়নি। তেমনি কথাটা ঐসময় তোলারই দরকার কি ছিল? মিলিকে বাড়িতে এনে.....হ্যাঁ রে রনি, তোর কি মিলিকে পছন্দ নয়? খুলে বল। সেক্ষেত্রে অন্যরকম করে ভাবতে হবে। দরকার হয় মণিকে বোঝাতে হবে।" ছোটমামা বীরেন বলে। 

- "কি পছন্দ ভগবান জানে। এদিকে সারাদিন ঐ মেয়ের সঙ্গে ঘুরতে দাও, উনি নেচে নেচে ঘুরে বেড়াবেন।" বনি মনে মনে বলে। 

- "দেখো মামু, আমার মনে হয় না, আমি কিছু ভুল কথা বলেছিলাম। তবে এসব ঝামেলায় আমার‌ও মনে হয়েছে, তখন না বললেই হত।" রনি এতদিন পর ছোটমামার প্রশ্নে কৃতজ্ঞ বোধ করে, কেউ ওকে কথা বলার সুযোগ দিল। 

- "এখন কি হবে? ওরা ভুল ভাবছে, সবচেয়ে বড় কথা তোর ব‌‌উ মিলিও চটে গেছে। শোন, তোকে একটা কথা বলি, তুই কিছুদিন ঐ বন্ধুর বাড়ি গিয়ে থাক আবার। আমরা সেটা বলে মিলির বাড়িতে বুঝিয়ে বলি, কাল মণির সঙ্গে মিলি আসুক। এক দু ঘন্টা থেকে, মণি ঘুমোলে বাড়ি চলে যাক। কয়েকদিন একটু যাতায়াত করুক। দুবেলা মণিকে দেখতে আসুক। তুই বাড়িতে থাকবি না জানলে যদি রাজি হয়।" ধীরেন ভেবেচিন্তে বলে। 

- "আমার অন্যায় হয়েছে সেদিন হঠাৎ যা মনে হয়েছে বলে দেওয়া। আগে বাড়ির সবার সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল। এখন মায়ের জন্য যা করতে বলবে, আমি করব।" সবার মাঝখান থেকে উঠে রনি ঘরে চলে আসে। 

মাথাটা টিপে ধরে চেয়ারে বসে থাকে রনি। মনে হয়, মিলি ওকে ফেলে চলে যাবে বলে মিথ্যে ভয় পেয়ে ও চলে গেছিল একদিন, মিলিকে একলা ফেলে। ওর মা সেদিন ওকে ফিরে আসতে বলেনি, মিলিকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছিল। একমাত্র বড়মামাই ওকে খানিকটা চাপ দিয়েছিল বাড়ি ফিরতে। 

সেই ছবিটা আজ উলটে গেছে। মা চায়, ও বাড়ি থেকে চলে যাক, বদলে মিলিকে বাড়িতে নিয়ে আসবে। তাহলে আর কেউ মাকে দোষ দেবে না। বড়মামা সেই আবদার রাখতে বলছে, ও চলে যাক, মিলি ওর ব‌উ হয়েও এ বাড়িতে এসে একলা থাক। 

🌹❤🌹❤🌹❤🌹

সেই কথাই বলে বনি মিলির বাড়িতে গিয়ে। পিউ আর দুই মামাও এসেছে ওর সঙ্গে। এদিকে অমর, শ্যামল, মনোজ, সবাই এসেছে ততক্ষণে। শ্যামল আর মনোজ সদ্য ঘটনাটা জেনেছে, এবং ওরা কিন্তু রনির উপর রাগ করেনি। বরং উলটো সুর তাদের গলায়। 

মনোজ বলে, "এটা ভাবা কি ঠিক হচ্ছে, রনির লিলির প্রতি টান আছে? মানছি, লিলিকে মেনে নিতে বলেছে। সমরদা, গোপাদি, তোমরা দুজনেই বলো তো, বাড়ির মেয়ে, একটা ভুল করে ফেলেছে, আর কতকাল শাস্তি দেবে? আমি তো ভাবছিলাম, মিলি ও বাড়ি গেলে তোমাদের বলব, এবার লিলির খোঁজ করো। আগে বললে মণিকাদিদের খারাপ লাগতে পারে, তাই চুপ ছিলাম। রনি যখন নিজেই কথা তুলে সুযোগ দিল, তোমরা এই ফাঁকে একটা চেষ্টা করতে পারতে।"

অমর বলে, "মনোজ, তুমি বুঝতে পারছ না। লিলি কতবড় অন্যায় করেছে, তার উপর সেটা আসলে রনির সঙ্গেই করেছে বলা যায়। সেই রনি ওকে সাপোর্ট করছে, ওর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। মানেটা ভাবো।"

- "মানেটা খারাপ ভাবছ কেন? কোথাও দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। ও দেখেছে লিলিও ভালো আছে, ও নিজেও মিলিকে নিয়ে ভালো থাকবে। তাই লিলিকে মেনে নিতে বলেছে। আমি তো বলব, রনির মনটা অনেক বড়। তাই ও লিলিকে মাপ করে দিয়েছে।" মনোজ স্পষ্ট করে বলে। 

- "এটা আমার‌ও মনে হয়। ফট করে ছেলেটার ইনটেনশন খারাপ ভাবা উচিত হয়নি। ও একটু রগচটা, ঝপ করে কিছু একটা করে ফেলে। আর সেটা মনোজ যেমন বলছে, মনটা পরিষ্কার বলেই হয়ত করে ফেলে।" শ্যামলেরও এক‌ই সুর। 

- "তার মানে তোমরা সবাই আমাকেই দোষী বলছ?" নিজের আত্মীয়রা রনির সুপারিশ করায় সমরের যেন অভিমান হয়। 

- "না সমরদা, তোমার দোষ নেই। কিন্তু আমার মনে হয়, তোমার ভুল ধারণা হয়েছে। সেই হিসেবে কথাবার্তা বলেছেন, তাই তোমার সিদ্ধান্তটা ঠিক লাগছে না। দেখো, রনি ফস করে চলে গেছিল বটে, কিন্তু মিলি অসুস্থ হয়েছে শুনে যেভাবে পেরেছে, আমাদের পাশে থেকেছে। ওর পড়াশোনার দিকটা দেখেছে। এগুলো যদি সবাইকে দেখানোর জন্যই করে থাকে, মিলিকে নিয়ে যেতেই চেয়েছে।" মনোজ সমরকে বোঝায়। 

- "তাহলে লিলিকে নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? তোমরা দেখোনি তাই, ওর বাড়ির সবাই বিরক্ত, থামতে বলছে, কিছুতে থামছে না।" গোপাও নিজের বিরক্তিটা বলে। 

- "থামবে কেন?" মুচকি হাসে শ্যামল, "শ্বশুর জামাই দুজনেই যে একরকম। দেখছি তো, অর্ধেক কথা শুনেই ডিসিশন হয়ে গেল। লিলির কথা তুলেছে বলেই তোরা প্রথমেই রেগে গেছিস। বাকি কথা জিজ্ঞেস করেছিস? গোপা, তোদের উচিত ছিল, ওকে সবটা বলতে দেওয়া। আরও প্রশ্ন করে করে জানা, কোথায় কিভাবে লিলির সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, লিলির বরকে দেখেছে কিনা, লিলি ওকে কি বলেছে, সব, সব কথা জানা উচিত ছিল।"

- "লিলির কথা আমরা জানতে চাই না শ্যামলদা।" অমর মুখ ফোলায়। 

- "ভুল করছ অমর, খুব বড় ভুল করছ। লিলির না বলে চলে যাওয়াটা যেমন অন্যায়, যাকে বিয়ে করেছে, সে ছেলে ভালোও হতে পারে। আর যদি ভালো না হয়, আরও বেশি করে মেয়েটাকে দেখা উচিত আমাদের। ছেলে মেয়ে ভুল করেছে, শাস্তি দেব, একেবারে ফেলে দেব? আর রনিও চলে গেছিল, ওকে একবার মাপ করেছিলাম, লিলিকে মাপ করতে কি?" শ্যামল অমরকে উদ্দেশ্য করে সবাইকে বলে। 

এদিকে মিলি ঘামছে, "সত্যিই তো, যুগলদা মানুষটা ভালো। তার সঙ্গেও দিদির ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। রনি মিটিয়ে দিয়েছে। আবার আমাদের দুজনের ভুল বোঝাবুঝি দিদিরা মিটিয়ে দিয়েছে। দিদির সঙ্গে বাবা মায়ের ভাব হলেই তো ভালো হত। বাবা মা দিদিকে মেনে নিলে রনি দিদির সঙ্গে প্রেম করার সুযোগ পেত? তা কি হয়?" মনে মনে কথাগুলো তোলাপড়া করতে করতে বুঝতে পারে, ওকে নিয়ে অনুষ্ঠানে হঠাৎ দিদির নাম তোলায় ওদের কার‌ও ভালো লাগেনি। তখন মনে হচ্ছিল, বাবাকে বলার আগে ওর কাছে একবার কথাটা বলার দরকার মনে করেনি? তার উপর বাবার শরীর খারাপ হওয়ায় ওর ভীষণ রাগ হয়েছিল রনির উপর। এখন মামা আর মেসোমশাই যা বলছে, রনির সঙ্গে কি অকারণে খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে? 

এরকম সময়ে এসে বনি মিলিকে মণিকার সঙ্গে ও বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার কথা বলল। 

চলবে