"প্রতিশোধ নাকি পরিনয় "
পর্ব : ১
~• নিজের চোখের সামনে নিজের প্রিয় বাবা মার রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখে থমকে গেল পৃথা। তার হাত পা দ্বিগুণ বেগে কাপতে লাগলো।
তার গোটা পৃথিবি যেনো উল্টে পাল্টে গেল। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে লাগলো কয়েকগুণ। চোখের কোটর বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে নজর নেই তার..! কিয়ৎক্ষণ পর তার হুশ ফিরতেই হু হুকরে কাদতে লাগলো।
হাঁটুমুড়ে দরজার কাছেই বসে পড়লো। পাশেই দাঁড়ানো তার ৮ বছরের ভাই কিছুই বুঝতে পারলো না। ওইটুকু বাচ্চা কি বা বুঝবে.! সেইরকম বোঝার বয়স তো হয়নি তার.! সে বুঝতে পারছে না তার বাবা মা দরজার কাছে শুয়ে আছে কেনো ? আর তার দিদিভাই বা এত কাদঁছে কেনো.?
তার দিদিভাই তো সহজে কাদার মেয়ে নয়.!
~• তাদের পরনে ব্লু হুইট স্কুল ড্রেস।
সবে মাত্র স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলো তারা। আজ তাদের স্কুল থেকে পিকনিক করতে নিয়ে গেছিলো। বেশ আনন্দ করেছে তারা। স্কুল থেকে তার বাবারই আনতে যাবার কথা ছিল। কিন্তু বাবা আসছে না দেখে তারা স্কুল বাসেই করে এসেছে। মেন গেটের কাছে যেখানে সবসময় বেশ কয়েকজন গার্ড নিয়মিত পাহারা দেন তাদের টিকি টুকুও দেখতে পাইনি তারা.!
তাইতো ছুটতে ছুটতে বাড়ি আসছিল ওরা.! পিকনিকে কত মজা করেছে সব কিছু তার বাবা মাকে তো বলতে হবে নাকি!
কিন্তু তাদের সবকিছুই ধুলোয় মিশে গেছে।
( রায় গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রী মালিক প্রদীপ রায় চৌধুরী।
প্রদীপ রায় চৌধুরী স্ত্রী কামিনী চৌধুরী তার বড়ো মেয়ে পৃথা রায় চৌধুরী বয়স ১২এবং একমাত্র ছেলে প্রনয় রায় চৌধুরী বয়স ৮ )
প্রনয় তার ক্ষুদে ছোট ছোট হাত দিয়ে দিদিভাইয়ের চোখ মুছে দিতে দিতে বলল....
" দিদিভাই তুই কাঁদছিস কেনো.? কাঁদিস না প্লিজ ?
আচ্ছা আমার সব চকলেট তোকে দিয়ে দেবো! তবুও কাঁদিস না দিদিভাই.! "
~• প্রনয় বুঝবে কি করে তার দিদিভাইয়ের সব হারিয়ে গেছে। বাঁচার উৎস তার আর নেই। প্রনয় ও তো জানে না সে কি হারিয়েছে। বুঝলে কি সে এ প্রশ্ন করত !
সে পাগলের মতো বাবাকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল কন্ঠে বলতে লাগলো....
" বাবা! বাবা চোখ খোলো বাবা! আমি আর দুষ্টুমি করবনা.! আর তোমাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাবার জন্য বায়না করবো না! আর বলবো না আমাকে এটা কিনে দাও ওটা কিনে দাও!
দেখো আমি এবার গুড গার্ল হয়ে যাবো। আমি না তোমার প্রিন্সেস! তোমার প্রিন্সেস এর জন্য অন্তত ওঠো বাবা!
প্লিজ বাবা চোখ খোলো।
আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি বাবা.! খুব ভালোবাসি তোমায়.! ও বাবা প্লিজ চোখ খোলো প্লিজ "
~• পৃথাকে দেখতে বিধ্বস্ত লাগছে। সাদা স্কার্ট এ রক্তের দাগ লেগে গেছে। প্রনয় চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। সে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে ভাবছে বাবা হয়তো ঘুমোচ্ছে।
হ্যাঁ তার বাবা তো ঘুমোছেই একেবারের জন্য!
পৃথা এবার তার মায়ের কাছে গেলো। কত দুষ্টুমি খুনসুঁটি করেছে তার মায়ের সাথে। তাদের পরিবার আনন্দে ভরা ছিল। বিশাল বড়ো বাড়ি তাদের।
পৃথা এবার মায়ের কাছে গেলো। মায়ের মাথাটা ফাটিয়ে দিয়েছে কেউ। মাথা রক্তে ভিজে গেছে শরীরের শাড়িটা। মায়ের মাথাটা সাবধানে নিজের কোলের ওপর নিলো।
বিষন্ন কন্ঠে বলে উঠলো...
" মা ! তুমিও কি আমার ওপর অভিমান করেছো। দেখো মা আর জালাবনা তোমায়.! আর বায়না ধরবো না এটা খাবো ওটা খাবো বল.! প্লিজ মা তুমি অন্তত চোখ খোলো। আমরা কত মজা করেছি জিজ্ঞাসা করবে না আমায়.! ও মা ওঠো না.! দেখো.....
~• বাকি কথাটা বলতে পারলো না যেহেতু ওরা ডাইনিং রুমে দরজার কাছেই বসা ছিল দেখতে পেলো ওপর দোতলা থেকে দু/ তিনটে লোক ওদের দিকেই তেড়ে আসছে। হয়তো এতখন ওদেরই খুঁজছিল। তাদের হাতে বন্দুক। এটা দিয়েই মেরেছে তার বাবা মাকে।
" এই মেয়ে দাড়া ওখানে! দাড়া বলছি.! সালার বাড়ি বানিয়েছে হেব্বি বড়। খুঁজতে খুঁজতে শালার দম ফেটে গেলো। শালী দাড়া তুই ! রায় চৌধুরী বংশ নিরবংশ করবো আমি ! আমার পথের কাটা এই প্রদীপ রায় চৌধুরী। শেষ করে দেবো সব "
~• বলতে বলতে লোকগুলো নিচেই নেমে আসছে দ্রুত বেগে। পৃথা মায়ের কপালে আর বাবার কপালে একটা করে চুমু খেলো। তার যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পেরেছে এখান থেকে না পালালে সে নিজে এবং তার আদরের ভাই কে বাঁচাতে পারবে না।
এমন সময় প্রনয় বললো...
" দিদিভাই এই দুষ্টু লোক গুলো কারা.? কিসব বলছে এই বাজে লোকগুলো.? "
" আমাদের পালাতে হবে সোনু ( প্রনয় ) ! এখান থেকে পালাতে হবে.! নাহলে তোকেও হারিয়ে ফেলবো আমি ! "
~• পৃথা প্রনয় কে সোনু বলেই ডাকে। পৃথা প্রণয়ের হাত শক্ত করে ধরলো বেশি সময় না নিয়েই খালি পায়েই দরজা থেকে বেরিয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগলো। যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে। লোকগুলোও পেছনে আসছে।
কি ওদের ভবিষ্যৎ? আদেও বাঁচবে কি দুজন ?
~~~~~~~~~||||~~~~~~~~~~||||~~~~~
~• দরজার ঠকঠক আওয়াজে নিজের জঘন্য অতীতের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো পৃথা ওরফে অদ্রি। হ্যাঁ তার পরিচয় এখন অদ্রি নামেই।
তার মাঝে মাঝেই তার অতীতের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে তার ছোট ভাইটার কথা। কিন্তু চোখের নিমিষে সব ওলট পালট হয়ে গেছিল সেদিন। না সে আর এসব নিয়ে ভাবতে চাই না। এখন তো তার প্রতিশোধ নেবার পালা। এতদিন নিজেকে কঠোর ভাবে তৈরি করেছে সে। নিজেকে উপযুক্ত করেছে সে। এবার তো শুরু আসল খেলা।
আদৃত: মে আই কামিং মেম !
অগ্নি: ইয়েস কামিং !
~• আদৃত দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। দেখতে পেলো অদ্রি বাইরের থাইগ্লাসের দিকে তাকিয়ে আছে। আদৃত বুঝতে পারলো না এই অদ্রি মেম সবসময় এত কি নিয়ে চিন্তা করে। গোটা সিআইডি ডিপারমেন্ট এর কাছে উনি অদ্রি নামেই পরিচিত। পাশাপাশি তিনি এসিপি নিলয় সেনগুপ্তের মেয়ে হিসেবে পরিচিত। তার একমাত্র...।
মেম তার একটু রেগে থাকে সবসময় কিন্তু মেম তার বড্ডো ভালো!
অদ্রি : তুমি কি এখানে সং এর মত দাঁড়িয়ে থাকতে এসেছো। কি বলার আছে বলো নয়তো যে পথ দিয়ে এসেছো সেই পথ দিয়েই ফিরে যাও। ফালতু সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।
~• আদৃত কিছুটা তথমত খেয়ে গেলো। মেম তার যে ভালই রেগে আছে তা গলার স্বর শুনে বোঝা যাচ্ছে। না বেশি কথা বাড়ালে হবে না। কোথায় এখুনি বন্দুক বার করে ঠাস ঠাস চালিয়ে দিল তখন আমার মত একটা ভালো অফিসার এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবে। এই দেশের কি হবে তখন। না না বিশ্বাস নেয় গুলি চালিয়েও দিতে পারে।
আদৃত : সরি দিদি থুক্কু মেম! আমি আসলে!
অদ্রি : আসলে নকলে না করে যেটা বলতে এসেছো বলো !
আদৃত : মেম এই নিন ফাইল এখানে মৃন্ময় সেন এর সমস্ত ডিটেলস দেওয়া আছে। আর উনি বেশ কিছু অস্ত্র পাঁচার , নারী পাঁচার এছাড়াও বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড কাজের সাথে যুক্ত আছে। এক কথায় আন্ডারগ্রাউন্ড এর সব কাজই ওনার কথায় চলে। আর তার কাজের পথে কেও দাঁড়ালে তাকে মেরে ফেলতেও দু বার ভাবেন না! আর ওনার এক মাত্র ছেলে রনি সেও সারাক্ষণ প্যাবে পড়ে থাকে। এছাড়াও খবর আছে অনেক মেয়েই ওনার হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে! কিন্তু কেউই কোনো প্রতিবাদ করতে পারে নি। যে এসেছে তাকেই মেরে ফেলেছে। পুলিশ ডিপারমেন্ট ও এ ব্যাপারে কোনো কিছুই করতে পারে নি। সবারই প্রাণের ভয় আছে। সাথে পরিবার ও। তাই কেউ আর এই কেস টা নিয়ে এগোতে চাই নি!
অদ্রি : আচ্ছা ঠিক আছে! ফাইল টা টেবিল এর ওপর রেখে চলে যাও!
আদৃত : মেম একটা কথা বলবো! যদি কিছু মনে না করেন!
অদ্রি : হ্যাঁ বলো!
আদৃত ;: মেম এই কেস টা তো কেউই নিতে চাইছিল না কিন্তু আপনি নিজে যেচে কেস টা নিতে চাইছেন! সি আইডি ডিপারমেন্ট এর বেশির ভাগ অফিসার কেস টা রিজেক্ট করে দিয়েছে।
~• আদৃত বহু সংকোচে কথা গুলো বললো।
আদৃত এর কথা শুনে অদ্রি বাকা হাসলো। ঠোঁটে লেগে আছে শয়তানি হাসি।
অদ্রি : আদৃত অন্যান্য অফিসার দের পিছুটান আছে ফ্যামিলি আছে তাই তাদের প্রাণের মায়া বেশি! কিন্তু আমার কেউ নেই আমি সম্পূর্ণ একা! তাই আমি আমার প্রাণের মায়া করি না! দেশের জন্য আমি প্রাণ দিতে প্রস্তুত তবে বিপক্ষ দল কে ধ্বংস করে! আর এমনিতেও মৃন্ময় সেন কে আমি বাঁচতে দিই কি করে! ওর সঙ্গে তো আমার বহু বছরের সম্পর্ক! ওকে শেষ করতে না পারলে আমার নিজেকে প্রস্তুত করাই বৃথা হয়ে যাবে !
~• শেষের কথা গুলো অদ্রি বিড়বিড় করে বলতে থাকলো।
আদৃত : কি বলছিস! থুক্কু মেম কিছু বলছেন! শুনতে পাচ্ছি না!
অদ্রি : শুনতে পাবে কি করে! বাইক এ মেয়ে নিয়ে ঘুরলে কি আমার কথা শুনতে পাবে!
~• আদৃত অদ্রির কথা শুনে চমকে উঠলো। মেম এটাও দেখে ফেলেছে। কি করে দেখলো। মেম এর নিশ্চয়ই চারটে চোখ ঠিক সবকিছু দেখে নেই। না এখন মানে মানে এখান থেকে কেটে পড়তে হবে! না হলে ভাগ্যে অশেষ দুর্গতি আছে! ভগবান একটা মোটা দড়ি ফালাও আমাকে উঠায় নও ! মেম তার শাকচুন্নি কি না!
আদৃত অদ্রির দিকে তাকিয়ে একটা কেবলা মার্কা হাসি দিলো।
আদৃত : আর মেম কি যে বলছেন! আসলে আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম দেখি না মেয়েটা দাড়িয়ে আছে বাসের জন্য! আমি তো দেশের জন্য কাজ করি বলুন! ভাবলাম মেয়েটাকে একটু নাহয় সাহায্য করি!
নাহলে ধরুন মেয়েটা ওখানেই বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেলো। তখন এম্বুলেন্স আসবে! হাসপাতালে নিয়ে যাবে! টাকা খরচা হবে! ওর চিকিৎসার জায়গায় তখন আরেকজনের চিকিৎসা হয়ে যাবে! শুধু শুধু দেশে কি করে ঝেমেলা বাড়তে দিই বলুন তো! আমারও তো কিছু কর্তব্য আছে নাকি! আর...
অদ্রি : থাক ! আমি আর শুনতে চাচ্ছি না ! আমার মুম্বাই এর ফ্লাইট কবে ?
আদৃত : মেম আপনার এসিপি সাহেব ফ্লাইট এর টিকিট কাটতে বারণ করেছে! সে নাকি আপনাকে একা ছারতে পারবে না!
অদ্রি : উফফ! তোমার এসিপি সাহেব কে নিয়ে আমি আর পারি না! আচ্ছা কোথায় এখন তোমাদের এসিপি সাহেব!
আদৃত : মেম বাবা থুক্কু স্যার ওনার ডেস্ক এ আছে!
অদ্রি : আচ্ছা ! তুমি এবার আসতে পারো!
আদৃত : ওকে মেম আসি তাহলে!
`~• আদৃত দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। অদ্রি এদিক ওদিক তাকাতে চোখ পড়লো ফাইল টার দিকে! এগিয়ে এসে ফাইল টা তুলে নিলো সে! ফাইল টা খুলতেই সামনের ব্যক্তির ছবি টা দেখার সাথে সাথে ওর চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো! এই চোখ কাউকে ভস্ম করে দিতে সক্ষম! চোখের সামনে আবারো ভেসে উঠছে কিছু ভয়ংকর অতীত!
অদ্রি : আমি ফিরে আসছি! মিস্টার মৃন্ময় সেন! তোমার মৃত্যু আমারই হাতে লেখা ! যারা যারা আমার বাবা মাকে মেরেছে আমার আদুরে ভাইকে আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে তাদের আমি এই অদ্রি এমন মৃত্যু দেবো যা কল্পনারও বাইরে! তোমাদের মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে ক্রমশ! মেরে ফেলবো সবকটা কে সবকিছু শেষ করে দেবো! সব কিছু! হা হাহা!
~• অদ্রি উদ্মতের মতো হাসতে লাগলো! তাকে দেখতে কোনো হিংস্র পশুর থেকে কম কিছু লাগছে না!
কোথায় গেলো তার ভাই ? সেদিন কি বা হয়েছিল? তার সেই জঘন্য অতীতের কেমন ছিল? পৃথা থেকে অদ্রি হওয়ার ঘটনায় বা কেমন ছিল? তার ভবিষ্যত ই বা কি? তার ভাই এখন কোথায়?
চলবে....
কেমন হয়েছে জানাবেন প্লিজ ? । ভালো লাগলে অনুসরণ করে পাশে থাকবেন। ধন্যবাদ!